Follow us

অভিজিৎ হত্যার বিচারে অনিশ্চয়তা, সাক্ষ্য দেবেন না বাবা অজয় রায়

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-10-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
অভিযুক্ত সন্দেহভাজন আসামীদের আদালতে হাজির করে পুলিশ। ঢাকা, অক্টোবর ১৬, ২০১৯।
অভিযুক্ত সন্দেহভাজন আসামীদের আদালতে হাজির করে পুলিশ। ঢাকা, অক্টোবর ১৬, ২০১৯।
ছবি: কামরান রেজা চৌধুরী

আদালতে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় প্রগতিশীল ব্লগার-লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার বিচারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমনকি সাক্ষী দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন নিহত অভিজিতের বাবা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অজয় রায়ও। তিনি এই মামলার বাদী।

গত ১ আগস্ট নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান ও সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর থেকে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য তিনটি তারিখ নির্ধারণ করে সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ ট্রাইবুনাল। সর্বশেষ সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ছিল বুধবার।

“কিন্তু অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার বাদী ও তাঁর বাবা অধ্যাপক অজয় রায়সহ প্রথম পাঁচজন সাক্ষীর কেউই আদালতে হাজির হননি,” বেনারকে বলেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

তিনি বলেন, “আগামী ২৮ অক্টোবর সাক্ষ্য গ্রহণের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছে আদালত।”

“এর আগে সাক্ষ্য গ্রহণের প্রথম তারিখ ছিল ১১ সেপ্টেম্বরে। সেদিনও কোন সাক্ষী হাজির হননি,” বলেন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

তিনি জানান, এরপরে দ্বিতীয় তারিখ ছিল ৬ অক্টোবর। সেদিন দুজন সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন। তবে সেদিন পর্যাপ্ত পুলিশ না থাকায় আটক চার আসামির কাউকে আদালতে হাজির করা যায়নি।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার বিচারের জন্য বাদী অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়ের সাক্ষ্য দেয়া জরুরি। কিন্তু আমি তাকে কয়েক দফা ফোন করে আদালতে আসতে অনুরোধ করেছি। তিনি আসবেন না বলে জানিয়েছেন।”

“আদালতে না আসার যুক্তি হিসেবে অজয় রায় আমাকে বলেছেন, আমার ছেলে তো মারা গেছে। আমি মামলা করেছি। আমার কথা বলেছি, এখন আদালতে যেতে হবে কেন,” বলেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “আমি বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছি, যাতে তারা মামলার বাদীকে আদালতে আনার ব্যবস্থা করেন।”

যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক অজয় রায় বেনারকে বলেন, “আমি বিচার চাই। কিন্তু আদালতে সাক্ষ্য দিতে যেতে চাই না। আমার বয়স হয়েছে। ‍নিহত পুত্রের বিচার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করা আমার জন্য খুবই বেদনাদায়ক হবে। শোকবিহ্বল পিতা হিসেবে বিচার প্রক্রিয়ার এই দৃশ্য সহ্য করতে পারব না।”

তিনি বলেন, “কয়েক দিন আগে আমার কাছে একজন পুলিশ কর্মকর্তা এসেছিলেন। আমি তাকে বলেছি যে আমি আদালতে সাক্ষ্য দিতে কোনোভাবেই যাব না। আপনারা যদি চান, তাহলে আমি লিখিতভাবে জানাব যে, আমি আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাব না।”

বেনারের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি তো মামলা করেছি। এখন পুলিশ ও অন্যান্য সাক্ষীদের উচিত আসামিদের বিচারের ব্যবস্থা করা। আমার মনে হয় না বিচারে কোন সমস্যা হবে।”

তবে আইনজীবীরা বলছেন, সাক্ষীর অভাবে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে আলোচিত এই মামলা বিচার।

ঢাকা বারের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বেনারকে বলেন, “যেকোনো মামলার বিচারের ক্ষেত্রে বাদীর সাক্ষ্য দেয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষ্য দেওয়া বিচার প্রক্রিয়ার মৌলিক ভিত্তি।”

“মামলার বাদী অধ্যাপক অজয় রায় সাক্ষ্য না দিলে সেটি হবে অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার বিচারের জন্য একটি বিরাট ধাক্কা ও অনিশ্চয়তা,” বলেন তিনি।

প্রকাশ রঞ্জন বলেন, “বাদীর সাক্ষ্য ছাড়া আসামিদের বিচার খুবই কঠিন। তাই সবার উচিত স্যারের (অজয় রায়) আবেগের কথা মাথায় রেখে তাকে কোনোভাবে বুঝিয়ে আদালতে উপস্থিত করা। প্রয়োজনে ভিডিও কলের মাধ্যমে স্যারের সাক্ষ্য গ্রহণ করা যেতে পারে।”

সাক্ষীরা গরহাজির

সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ আদালতের ডেস্ক কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় মোট ৩৪ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

তিনি বেনারকে বলেন, “গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ক্রমানুসারে মোট পাঁচজনকে সাক্ষ্য দিতে সমন জারি করা হয়। তারা হলেন, অধ্যাপক অজয় রায়, মো. মাসুদুর রহমান, আলিমুজ্জামান,  মো. সেলিম ও মো. আফজাল হোসেন।”

অধ্যাপক অজয় রায় ছাড়া বাকিরা প্রত্যক্ষদর্শী সাধারণ মানুষ। অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা এই মামলার ১৫ নম্বর সাক্ষী।

রুহুল আমিন বলেন, “আদালতে হাজির হওয়ার জন্য পাঁচজনের সবাইকে সমন জারি করেছি। ১১ সেপ্টেম্বর আসামিদের আদালতে হাজির করা হলেও কোন সাক্ষী হাজির হননি। ৬ অক্টোবর আসামিদের হাজির করতে পারেনি পুলিশ। আজ (বুধবার) আসামিদের আনা হয়। কিন্তু কোন সাক্ষী আদালতে আসেননি।”

তিনি বলেন, “আগামী তারিখ ২৮ অক্টোবর আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আজ আদালত থেকে পুনরায় তাদের প্রতি সমন জারি করা হয়েছে।”

উল্লেখ্য, আমেরিকা প্রবাসী অভিজিৎ রায় মুক্তমনা নামের একটি ব্লগ চালাতেন। তিনি ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লিখতেন।

২০১৫ সালে একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণের জন্য আমেরিকা থেকে সস্ত্রীক ঢাকায় আসেন অভিজিৎ রায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরের কাছে তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে আনসার আল ইসলামের জঙ্গিরা। চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই হামলায় রাফিদা আহমেদ দুটি আঙুল হারান।

পরে পুত্র হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করেন বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অজয় রায়। তবে দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় ধরে তদন্তের পর জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামকে দায়ী করে ১৩ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমস ইউনিট। ১ আগস্ট ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত।

অভিজিৎ হত্যার মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন: সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে জিয়া, আরাফাত রহমান ওরফে শামস ওরফে সাজ্জাদ, মোজাম্মেল হোসেন ওরফে সায়মন ওরফে শাহরিয়ার, আবু সিদ্দিক ওরফে সোহেল ওরফে সাকিব, আকরাম হোসেন আবির ওরফে আদনান ও শফিউর রহমান ফারাবী। এদের মধ্যে মেজর জিয়াউল ও আকরাম পলাতক রয়েছেন।

নির্ভার আসামিপক্ষ

এদিকে সাক্ষী না আসায় বেশ নির্ভার দেখা যায় আসামিপক্ষকে।

বুধবার সকালে আটক চার আসামিকে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি জেল থেকে ঢাকায় আদালতে হাজির করা হয়। আসামিদের সাথে তাদের পরিবারের সদস্যরা দেখা করেন।

মামলার অন্যতম আসামি আবু সিদ্দিক সোহেলকে দেখতে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী ও ভায়রা তানিম বিন মাহফুজ। তানিম বেনারকে বলেন, “আমরা আদালতে আসি। কোন সাক্ষী আসে না।”

“আমি মনে করি না সোহেল এই হত্যার সাথে জড়িত ছিল। আশা করি আমরা ন্যায়বিচার পাব,” বলেন তানিম।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন