Follow us

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে গোলাগুলি বিএসএফের এক সদস্য নিহত

কামরান রেজা চৌধুরী ও শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-10-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সেন্টমার্টিন দ্বীপে বিজিবি মোতায়েনের ফাইল। এপ্রিল ০৭, ২০১৯।
সেন্টমার্টিন দ্বীপে বিজিবি মোতায়েনের ফাইল। এপ্রিল ০৭, ২০১৯।
ছবি: বিজিবি।

সীমান্ত নদী পদ্মায় ইলিশ মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে গোলাগুলিতে বিএসএফের এক সদস্য নিহত এবং আরেক সদস্য আহত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহী জেলার চারঘাট-মুর্শিদাবাদ সীমান্তে এই গোলাগুলির বিষয়টি বেনারকে নিশ্চিত করেছেন বিজিবি’র পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্ণেল মো. মহিউদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেন, বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করা হবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে বিএসএফ সদস্যরা বিজিবি সদস্যদের ওপর গুলি চালায়। আত্নরক্ষার্থে বিজিবি সদস্যরা গুলি চালালে ওই বিএসএফ সদস্যের মৃত্যু হয়।

ভারতের শীর্ষ বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত বিএসএফ সদস্যের নাম বিজয়ভান সিংহ। তিনি বিএসএফ’র হেড কন্সটেবল ছিলেন।

বিএসএফ’র ভাষ্য অনুযায়ী, বিজিবি সদস্যরা ‘অতর্কিত’ বিএসএফ সদস্যদের ওপর গুলি চালালে বিজয়ভান সিংহ নিহত হন।

বৃহস্পতিবার রাত  সাড়ে এগারোটার দিকে ধানমণ্ডির বাসভবনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন,  “বিজিবি আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি করলে একজন বিএসএফ সদস্য মারা গেছেন, আহত হয়েছেন একজন। এটা দুঃখজনক, নেহাত একটি দূর্ঘটনা, যা কারোই কাম্য ছিল না।”

“বিজিবি ইতিমধ্যে বিএসএফের সাথে কথা বলছে। আশা করি সুন্দর একটা সমাধান হয়ে যাবে: বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

গত ১০ অক্টোবর কুমিল্লা সীমান্তে মাদক উদ্ধারে গিয়ে ভুল করে ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশ করায় বিএসএফের হাতে র‍্যাবের তিন সদস্য ও দুই সোর্স আটকের এক সপ্তাহ পর এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বৃহস্পতিবারের এই গোলাগুলির ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কোন প্রভাব ফেলবে না। কারণ দুই দেশ এবং দুই বাহিনীর সম্পর্ক অনেক ভালো।

বিজিবির বক্তব্য

রাজশাহীর চারঘাটে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে বিজিবি। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনাটি ১৭ অক্টোবর আনুমানিক ১০টা ৪০ মিনিটে রাজশাহী ব্যাটালিয়নের অন্তর্গত চারঘাট বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায়। সেখানে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্য লাইন থেকে পদ্মা নদীর পাড়ে আনুমানিক ৩৫০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত থেকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী তিন জেলেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় মাছ ধরতে দেখা যায়।

এ সময় বিজিবির চারঘাট বিওপি’র টহল দল মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান তদারকির জন্য উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের ফিল্ড এ্যাসিস্ট্যান্ট আবু রায়হান এবং আরও দুই জন সহকারীসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে এক ভারতীয় জেলেকে অবৈধ কারেন্ট জালসহ আটক করে। বাকি দুই জেলে ভারতের দিকে নৌকা নিয়ে পালিয়ে যায়।

পরবর্তীতে বিএসএফের ১৭১ ব্যাটালিয়নের কাগমারী বিওপি থেকে স্পীডবোটযোগে চার বিএসএফ সদস্য রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালুঘাট এলাকার শাহারিয়াঘাটের বড়াল নদীর মুখে আনুমানিক ৬৫০ গজ বাংলাদেশের ভিতরে অনুপ্রবেশ করে। বিজিবি সদস্যরা তাদের বাধা দেয়।

ওই চার জনের মধ্যে বিএসএফের একজন সদস্য ইউনিফর্ম পরা থাকলেও বাকিরা হাফ প্যান্ট ও গেঞ্জি পরা ছিল। বিএসএফের টহল দলটির কাছে অস্ত্রও ছিল।

বিবৃতিতে বলা হয়, বিএসএফ সদস্যরা বিজিবির হাতে আটক ভারতীয় জেলেকে জোর করে ফিরিয়ে নিতে চাইলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিয়মমাফিকভাবে তাদের ফেরত দেয়া হবে।

বিজিবি আরও জানায়, অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় নিয়ম অনুযায়ী পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাদেরও বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

তখন বিএসএফ সদস্যরা  আটক ভারতীয় জেলেকে জোর করে নেওয়ার চেষ্টা করে। বিজিবি সদস্যরা তাদের বাধা প্রদান করে। এ সময় বিএসএফ সদস্যরা উত্তেজিত হয়ে গুলি চালায় এবং গুলি করতে করতে স্পীডবোট চালিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে চলে যেতে থাকে। বিজিবি টহল দলও তখন আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়।

এ বিষয়ে রাজশাহী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক এবং বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্টের মধ্যে বৃহস্পতিবার পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে জানানো হয়, ওই ঘটনায় এক বিএসএফ সদস্য নিহত এবং আরও এক সদস্য আহত হয়েছে।

পতাকা বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উভয়পক্ষ তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।

এ বিষয়ে আরও আলোচনার জন্য আবার পতাকা বৈঠক করার ব্যাপারে উভয়পক্ষ একমত হয়েছেন।

বিএসএফ যা বলছে

আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বৃহস্পতিবার বলা হয়, মুর্শিদাবাদ জলঙ্গিতে জলসীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে গিয়েছিল তিন ভারতীয় জেলে। তাদের উদ্ধার করতে গিয়েছিল বিএসএফ সদস্যরা।

বিজিবি বিষয়টি বিএসএফের সিনিয়র কর্মকর্তাদের জানান। দুপক্ষের মধ্যে ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের পর তিনজন জেলের মধ্যে দুজনকে ছেড়ে দেয় বিজিবি। অপরজনকে ছাড়তে অপারগতা জানায় বিজিবি।

এমন পরিস্থিতিতে দুজনকে নিয়ে কাটমারি চর বর্ডার পোস্টের দিকে ফিরছিল বিএসএফের পাঁচজনের একটি দল।

বিএসএফ দাবি করেছে, দুই মৎসজীবীকে উদ্ধার করে ফেরার পথে আচমকা বিজিবি গুলি চালায়। ওই ঘটনায় নিহত হন বিএসএফের হেড কন্সটেবল বিজয়ভান, তাঁর মাথায় গুলি লাগে।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

এক সপ্তাহ আগে র‍্যাবের সেই ঘটনার সাথে বিজিবির এই ঘটনাটি মেলানো একদমই ঠিক  হবে  না বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপত্তা  বিশ্লেষক  ইশফাক  ইলাহী  চৌধুরী।  তিনি বেনারকে  বলেন, “স্থানীয়  পর্যায়ে  ভুল বোঝাবোঝির কারণে এমনটা ঘটে থাকতে পারে। এটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত, এমন ঘটনা কাম্য নয়।”

ইশফাক ইলাহী আরও বলেন, “তবে এটা ভারতের  সাথে  আমাদের আন্তঃসীমান্ত সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। কারণ বিজিবি-বিএসএফের সৌহার্দ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন