অভিজিৎ রায় হত্যাকারীদের তথ্য দিলে ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার দেবে যুক্তরাষ্ট্র

বেনার স্টাফ
ওয়াশিংটন ডিসি
2021-12-20
Share
অভিজিৎ রায় হত্যাকারীদের তথ্য দিলে ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার দেবে যুক্তরাষ্ট্র নিহত বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় (ডানে) ও তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা।
[সৌজন্যে: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর]

বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা এবং তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে গুরুতর আহত করার সাথে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি সার্ভিসের রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস (আরএফজে) অফিসের মাধ্যমে এই পুরস্কার দেওয়া হবে বলে সোমবার এক বিবৃতিতে জানানো হয়।

ওই হামলায় জড়িত চার আসামি কারাগারে থাকলেও সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়া এবং আকরাম হোসেন পলাতক।

অভিজিৎ ও বন্যাকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক উল্লেখ করে সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তাঁদের ওপর হামলার সাথে জড়িত কারো সম্পর্কে তথ্যের জন্য পাঁচ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় ৪৩ কোটি টাকার বেশি) পর্যন্ত পুরস্কার অনুমোদন দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক টুইটেও এই পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসীরা ২০১৫ সালে অভিজিৎ রায়কে হত্যা এবং তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদকে আহত করে।

কারো কাছে মেজর জিয়া, আকরাম হোসেন বা ওই হামলায় জড়িত অন্য কারো বিষয়ে তথ্য থাকলে সিগন্যাল, টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে তথ্য পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে টুইটে বলা হয়, “আপনিও পুরস্কার পেতে পারেন।”

তথ্য দেওয়ার জন্য +১-২০২-৭০২-৭৮৪৩ নম্বরটি উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় অভিজিৎ রায়কে। হামলায় অভিজিতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও গুরুতর আহত হন।

“সাজাপ্রাপ্ত দুই ষড়যন্ত্রকারী সৈয়দ জিয়াউল হক (ওরফে মেজর জিয়া) এবং আকরাম হোসেনের অনুপস্থিতিতেই বিচার করা হয়েছে এবং তাঁরা পলাতক রয়েছেন,” বলেছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাত বছর পর আসামিদের ধরিয়ে দিতে কেন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র সোমবার বেনারকে জানান, “পুরস্কারটি এখন ঘোষণা করা হয়েছে কারণ, এখনো তদন্ত চলমান।”

“ওই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় দায়ীদের আইন বিচারের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করতে এখন এই তথ্য চাওয়া হচ্ছে,” বলেন ওই মুখপাত্র।

হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা বাংলাদেশে

আল-কায়েদা-অনুপ্রাণিত স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠী আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) এবং আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা (একিউআইএস) এই হামলার দায় স্বীকার করেছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

“হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা বাংলাদেশের বলে ধারণা করা হচ্ছে,” বলা হয়েছে আরএফজে’র ওয়েবসাইটে।

পুরস্কারের ঘোষণা দিতে গিয়ে তাঁরা লিখেছে, “অভিজিৎ রায় একজন লেখক, ব্লগার এবং অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে মৌলবাদকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।”

“তিনি বাংলাদেশের নাস্তিক ব্লগারদের দুর্দশার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের সমন্বয়ক ছিলেন এবং সামাজিক দমন-পীড়নের পরিচিত সমালোচক ছিলেন। তার স্পষ্টবাদী বিশ্বাস এবং সক্রিয়তার জন্য তাকে ‘টার্গেট’ করে হত্যা করা হয়েছিল,” যোগ করেছে আরএফজে।

চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ হত্যায় জড়িত পাঁচ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড এবং প্ররোচনাকারী ব্লগারের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয় ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পাঁচ আসামি হচ্ছেন; আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান ও বরখাস্ত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক, জঙ্গিনেতা আকরাম হোসেন ওরফে আবির ওরফে আদনান, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ও আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম। তাঁদের মধ্যে পলাতক জিয়া ও আকরাম।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া শফিউর রহমান ফারাবী কারাগারে রয়েছেন।

“স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশের জন্য অভিজিৎ রায়কে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়,” উল্লেখ করে আদালত সেদিন জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে ‘নাস্তিকতার অভিযোগ এনে’ নিষিদ্ধ সংগঠন আনসার আল ইসলাম, অর্থাৎ সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্যরা তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন রাতে অভিজিতের বাবা প্রয়াত অধ্যাপক অজয় রায় বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরে মামলাটির তদন্তভার দেয়া হয় কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে।

তদন্ত শেষ হতে চার বছরের বেশি সময় লাগে। ২০১৯ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা মহানগর হাকিম সরাফুজ্জামান আনসারীর আদালতে ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পুরস্কার ঘোষণা বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বন্যা আহমেদসহ অভিজিতের পরিবারের কারো সাথে যোগাযোগ করা যায়নি।

অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার পাশাপাশি চলতি বছর এলজিবিটি অ্যাক্টিভিস্ট জুলহাজ মান্নান ও খন্দকার মাহবুব তনয় হত্যা এবং প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার মামলার রায়েও মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন স্টেট ডিপার্টমেন্ট উল্লেখিত মেজর জিয়া (৪২) ও আকরাম (৩০)।

এদের মধ্যে এবিটির সামরিক প্রধান জিয়াকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০১৬ সালে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ পুলিশ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের পাশাপাশি সারা দেশে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট জিয়াকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে গত আগস্টে জুলহাজ-তনয় হত্যা মামলার রায়ের পর বেনারকে জানান ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশনস্) মো. ফারুক হোসেন।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে শরীফ খিয়াম।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন