পদ্মা সেতু: রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায় করবে চীনা প্রতিষ্ঠান

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.04.07
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
পদ্মা সেতু: রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায় করবে চীনা প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতু। ২৩ অক্টোবর ২০২১।
[ফোকাস বাংলা]

এবার পদ্মা সেতুর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায়ের কাজ পেলো চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড, সেতু নির্মাণের সাথেও যুক্ত ছিল এই কোম্পানিটি।

টোল আদায়ে প্রতিষ্ঠানটির সাথে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ান কোম্পানি কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে কর্পোরেশন।

এই দুই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কোম্পানি আগামী পাঁচ বছরের জন্য কাজ করবে, এতে খরচ হবে প্রায় ছয়শ তিরানব্বই কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আ.হ.ম. মুস্তাফা কামালের সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় সেতু বিভাগের এই প্রস্তাব অনুমোদন করা হয় বলে বেনারকে নিশ্চিত করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।

পদ্মা সেতু চলতি বছরের শেষের দিকে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে বুধবার জাতীয় সংসদে জানান বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

টোল থেকে তোলা হবে সেতুর খরচ

পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে তা টোল আদায়ের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হবে বলে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি, সেতুর আয় থেকে সরকার “কিছু লাভও করতে চায়” বলে জানান তিনি।

তবে যানবাহন পারাপারের জন্য টোলের হার এখনও নির্ধারণ হয়নি বলে তিনি জানান।

দেশের অন্যতম বৃহৎ নদী পদ্মা বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানী ঢাকা থেকে পৃথক করে রেখেছে। দেশের এই বিশাল অংশকে রাজধানীর সাথে সড়ক ও রেলপথে সরাসরি যুক্ত করতে নির্মাণ করা হয়েছে ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পদ্মা সেতু।

বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে তিন দশমিক আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করেছে চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড এবং নদী শাসনের কাজ করেছে আরেক চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন লিমিটেড।

দোতলা এই সেতুটির নিচে রেলপথ ও ওপরে থাকবে সড়কপথ।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক সমীক্ষায় জানানো হয়, পদ্মাসেতু দিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের ২৪ হাজার যানবাহন চলাচল করবে। সরকারি হিসাবে পদ্মা সেতুর কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি শতকরা দুই ভাগ বৃদ্ধি পাবে।

বৃহস্পতিবার অনুমোদন দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী চায়না মেজর ব্রিজ সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ও কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানটি অপারেশনের দিক দেখবে বলে বেনারকে জানান সেতু বিভাগের সচিব মোঃ মনজুর হোসেন।

দেশের কোম্পানিগুলোও এই কাজ করতে সক্ষম

বেনারের হাতে আসা সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার সভায় উপস্থাপিত কার্যপত্র অনুযায়ী, কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই প্রতিষ্ঠান দুটিকে পদ্মা সেতুর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায়ের কাজ দেয়া হয়। 

এর আগে চীনা কোনো কোম্পানি বাংলাদেশে কোনো সেতুর টোল আদায়ের কাজ করেনি জানিয়ে সেতু বিভাগের সাবেক সচিব বেলায়েত হোসেন বৃহস্পতিবার বেনারকে বলেন, “চীনা কোম্পানিকে কাজ দেয়ার কারণ হতে পারে, সুবিধা। চায়না মেজর ব্রিজ কন্সট্রাকশন পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে। সেকারণে এই সেতুর রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য কাজ তারাই সহজে করতে পারবে।”

যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর প্রথম পর্যায়ে সেতু নির্মাণকারী কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান দাইয়ুকে “সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায়ের কাজ দেওয়া হয়” বলে জানান তিনি।

তবে বেলায়েত হোসেনের এই মতামতের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল হক বেনারকে বলেন, “সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায় কোনো রকেট সায়েন্স নয়। আমাদের দেশের কোম্পানিগুলোও এই কাজ করতে সক্ষম।”

চীন-কোরিয়ার কোম্পানিকে দিয়ে এই কাজগুলো করলে বাংলাদেশের “সক্ষমতা তৈরি হবে না,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “উন্মুক্ত দরপত্র আহবান করা হলে আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো অংশ নিতে পারত এবং তারা যদি এই কাজ করার সুযোগ পেত তাহলে ভবিষ্যতে তারা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে কাজ করতে পারত।”

তাঁর মতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বাংলাদেশের আইনে গ্রহণযোগ্য হলেও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হলে স্বচ্ছতার বিষয়টি নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারত না।

আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করে সরকার। পরে বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৩-০৫ সালের মধ্যে জাইকার অর্থায়নে পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়।

২০০৯-১১ সালের মধ্যে সেতুটির পরিপূর্ণ ডিজাইন শেষ হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়।

চার বছরের মধ্যে কাজটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি কয়েক দফা বেড়ে বর্তমানে সেতুটির শতকরা ৯৬ ভাগের বেশি কাজ শেষ হয়েছে।

চলতি বছরের জুন মাসে সেতুটি উন্মুক্ত করে দেবার কথা থাকলেও বুধবার সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, পদ্মা সেতু এ বছর শেষের দিকে উন্মুক্ত করে দেয়া হবে।

এই বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে সেতু চালু করার জন্য কিছু মালামাল সময়মত আসছে না। সেজন্য সেতুর উদ্বোধন জুনের পরিবর্তে ডিসেম্বরে হবে।

তবে কোন ধরনের মালামাল আসছে না সেব্যাপারে কিছু বলেননি তিনি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন