চীনা অর্থায়নে জাহাজ থেকে জ্বালানী আনা প্রকল্প: তিনবার সংশোধন, প্রতিবার বাড়ছে খরচ

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.05.10
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
চীনা অর্থায়নে জাহাজ থেকে জ্বালানী আনা প্রকল্প: তিনবার সংশোধন, প্রতিবার বাড়ছে খরচ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর এলাকার কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করে রাখা তেলবাহী লাইটার জাহাজ। ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।
[বেনারনিউজ]

গভীর সমুদ্রে অবস্থান করা জাহাজ থেকে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি জ্বালানি তেল শোধনাগারে আনতে চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের মেয়াদ এ বছর জুন থেকে বাড়িয়ে আগামী জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় সিঙ্গেল মুরিং উইথ ডাবল পাইপলাইন (থার্ড রিভাইজ) প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৫ সাল থেকে ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে বেনারকে জানান পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শাহেদুর রহমান।

মঙ্গলবারের সংশোধনীসহ ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে গৃহীত প্রকল্পটি তিনবার সংশোধন করা হলো। প্রতিবার সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পের খরচ এবং বাস্তবায়নকাল বৃদ্ধি করা হয়েছে।

বিদেশ থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলবাহী বড়ো বড়ো জাহাজ বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করতে পারে না বলে বেনারকে জানান সরকারি শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান।

তিনি বলেন, তেলবাহী বিদেশি জাহাজগুলো সমুদ্রের বেশি গভীরতার এলাকায় নোঙর করার পর সেগুলো থেকে ছোট ছোট জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে কাছে ইস্টার্ন রিফাইনারির ঘাটে নিয়ে পাইপ দিয়ে পরিশোধনের জন্য নেয়া হয়। ফলে সময় এবং খরচ দুই-ই বেশি দরকার হয়।

“বর্তমানে আমাদের যে পাইপলাইন আছে সেটি সিঙ্গেল লাইন। এই লাইন দিয়েই একবার পরিশোধিত এবং একবার অপরিশোধিত তেল রিফাইনারিতে নেয়া হয়,” বলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

তিনি বলেন, “বড়ো বড়ো জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সহজে জ্বালানী শোধনাগারে আনতেই এই ডবল লাইন প্রকল্প।”

“এর মাধ্যমে কুতুবদিয়া থেকে সাগরের তলদেশ দিয়ে ২১০ কিলোমিটার ডবল পাইপলাইন দিয়ে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল আমাদের শোধনাগারে আনা যাবে,” বলেন মো. লোকমান।

তিনি বলেন, “বাস্তবায়িত হলে এটিই হবে এ ধরনের বড়ো বড়ো জাহাজ থেকে পরিশোধিত, অপরিশোধিত জ্বালানি পরিবহনে দেশের প্রথম ডবল পাইপলাইন প্রকল্প।”

চীনা এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

বর্তমানে প্রকল্পটির প্রায় ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানান মো. লোকমান। 

সংশোধনের পর সংশোধন

একনেক বৈঠকে উপস্থাপিত কাগজপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে প্রকল্পটির খরচ মোট দাঁড়াল প্রায় সাত হাজার ১২৫ কোটি টাকা যার মধ্যে চীনা এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রকল্প সাহায্য হিসাবে আসবে চার হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার বেশি। বাকি অর্থ বাংলাদেশ সরকারের।

২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল প্রায় চার হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করতে বলা হয়েছিল।

প্রকল্পটি ওই বছরই প্রথম সংশোধন করে ব্যয় বৃদ্ধি করে পাঁচ হাজার ৪২৬ কোটি টাকার বেশি নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবায়নের সময় অপরিবর্তিত রাখা হয়।

অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধি না করে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।

এরপর পুনরায় প্রকল্পটি সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ছয় হাজার ৫৬৮ কোটি টাকার বেশি। এর বাস্তবায়ন সময়সীমা ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।

মঙ্গলবার একনেকে পুনরায় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করার ফলে প্রকল্পটির সর্বশেষ খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত হাজার ১২৫ কোটি টাকা।

প্রকল্প বার বার সংশোধনের কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মো. লোকমান বলেন, “প্রকৃতপক্ষে আমাদের এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নেই। সেকারণে সমস্যা হয়েছে।”

এ বিষয়ে চীনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে বেনারের পক্ষ থেকে চীনা দূতাবাসে ই-মেইলের মাধ্যমে অনুরোধ পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি। 

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে

একনেক অনুমোদনের জন্য জ্বালানি বিভাগের পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আমদানিকৃত অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি সহজে, নিরাপদে, স্বল্প খরচ ও স্বল্প সময়ে খালাস করা সম্ভব হবে এবং বিকল্প জ্বালানি তেল সংরক্ষণাগার নির্মাণের ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।

এর ফলে বর্তমান জ্বালানি শোধনাগারের বার্ষিক অপরিশোধিত জ্বালানি পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে ৪৫ লাখ মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত হবে বলে জানানো হয় প্রস্তাবনায়।

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড জরুরি কারণে বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প হিসাবে মহেশখালীতে ট্যাঙ্ক ফার্ম স্থাপন করা হবে যাতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত না হয়।

পুরো প্রকল্পের মাধ্যমে পরিশোধিত তেল মজুদ ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে জানান হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা!

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বারবার প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা বৃদ্ধির মূল কারণ “অভ্যন্তরীণ কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা।”

তিনি বলেন, “একটি প্রকল্প প্রণয়নের আগে বিভিন্ন পরামর্শক নিয়োগ করে বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু দেখা যায় প্রকল্প শেষ হওয়ার সময় একটি ত্রুটি বের করে পুনরায় প্রকল্প সংশোধন করে অর্থ ও সময় দুই-ই বৃদ্ধি করা হয়।”

তাঁর মতে, এর ফলে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ঋণ নিয়ে বাস্তবায়ন করা প্রকল্পগুলো “যে ফলাফলের কথা বিবেচনায় রেখে গ্রহণ করা হয় সেগুলো থেকে তেমন উপকার পাওয়া যায় না।”

“সরকারের উচিত বাস্তবায়নের আগেই সকল খুঁটিনাটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প হাতে নেয়া,” বলেন গোলাম মোয়াজ্জেম।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন