মূল্যায়ন প্রতিবেদন: বিশ্বের অন্যতম পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠান হবে বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র

আহম্মদ ফয়েজ
ঢাকা
2021-06-15
Share
মূল্যায়ন প্রতিবেদন: বিশ্বের অন্যতম পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠান হবে বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নির্মাণাধীন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকরা প্রকল্পের কিছু স্থাপনা ও যন্ত্রপাতিতে আগুন ধরিয়ে দেবার পর ঘটনাস্থল থেকে সরে যাচ্ছেন একজন শ্রমিক। ১৭ এপ্রিল ২০২১।
[বেনারনিউজ]

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে চীনের দুটি প্রতিষ্ঠান ও এস আলম গ্রুপের যৌথ মালিকানায় নির্মাণাধীন ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিশ্বের অন্যতম পরিবেশ দূষণকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি হবে বলে মঙ্গলবার মন্তব্য করেছে তিনটি পরিবেশবাদী সংগঠনের মূল্যায়ন। 

সংগঠনগুলো জানায়, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে (ইআইএ) ভুল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত দেবার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাত্ত বাদ দেওয়া হয়েছে, যা গুরুতর আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়। 

সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ এবং চীনে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র যে মাত্রায় দূষণ অনুমোদন করা হয়, তার তুলনায় পাঁচ থেকে ১০ গুন বেশি দূষণকে অনুমোদন করা হয়েছে এসএস পাওয়ার প্লান্টের ইআইএ প্রতিবেদনে। 

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ইআইএ প্রতিবেদনে বায়ু দূষণের ফলে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাবের বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত পারদ দূষণের ফলে স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে তা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।

“বাতাসের মান নির্ধারণের জন্য যে পদ্ধতি (এয়ার কোয়ালিটি মডেলিং) অবলম্বন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুল। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সম্ভাব্য দূষণের মাত্রা কয়েকগুণ কমে গেছে। সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করে যে ফল পাওয়া যেত, তা কয়েকগুণ বেশি নির্গমনের পূর্বাভাস দিত,” প্রতিবেদনে বলা হয়। 

ইআইএ-তে যেসব নির্গমন উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে তা অসঙ্গতিপূর্ণ এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে সর্বোচ্চ নির্গমনের উপাত্ত ব্যবহার না করে গড় নির্গমনের উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। 

“বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্গমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। এর ফলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে পরিমাণ সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হবে, তা চীনে আইনিভাবে অনুমোদিত নির্গমন হারের পাঁচ গুণ বেশি। আর নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমনের ক্ষেত্রে ওই হার চীনে অনুমোদিত হারের চেয়ে ১০ গুণ বেশি,” বলা হয় প্রতিবেদনে। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারের পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বেনারকে বলেন, প্রতিবেদনটি পেলে তাঁরা এর আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। 

“প্রতিবেদনটি আমাদের হাতে আসলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অবহিত করা হবে। প্রয়োজনে আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরে এটি পাঠাব,” বলেন প্রকৌশলী হোসাইন। 

প্রতিবেদন সম্পর্কে বক্তব্য জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে প্লান্ট কর্তৃপক্ষ। বেনারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে, এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) এবাদত হোসেন বলেন, “এই প্রতিবেদনের বিষয়ে আমি এই মুহূর্তে কথা বলতে চাই না।” 

এসএস পাওয়ার প্লান্টের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন (ইআইএ) বিশ্লেষণ করে মঙ্গলবার এমন তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করেছে দেশি এবং আন্তর্জাতিক তিনটি পরিবেশবাদী সংগঠন। সংগঠনগুলো হচ্ছে; ফিনল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক দেনাবিষয়ক কর্মজোট। 

প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ

মূল্যায়নে বলা হয়, সাধারণ অবস্থায় যে কোনো প্রকল্পের ইআইএ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে পাওয়ার কথা কিন্তু এই প্রকল্পের ইআইএ প্রতিবেদনটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, যা প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়েও উদ্বেগের সৃষ্টি করে। 

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বেনারকে বলেন, একটি প্রকল্প হাতে নিলে তার পরিবেশগত প্রভাব কী হতে পারে, সেটি নিরূপণের জন্য ইআইএ করতে হয়। এটি একটি মুক্ত দলিল যা যে কেউ দেখতে পারেন।

“প্রকল্পগুলোর উচিত ইআইএ প্রতিবেদন প্রকাশ করা, যাতে এটি সম্পর্কে মানুষ ধারণা পেতে পারে। এই প্রতিবেদন প্রকাশ না হলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়,” বলেন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী জামিল। 

এদিকে রোববার ‍যুক্তরাজ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে সাতটি ধনী দেশের ফোরাম জি-৭ সামিট শেষ হয় এই প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে যে, কয়লা-ভিত্তিক প্রকল্পে সহায়তা থেকে সরে আসবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকার এবং এর বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহারেও বেশি তৎপর হবে। 

এর প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এশিয়ান দেশগুলোতে কয়লা-ভিত্তিক প্রকল্পের চাপ কমানো না গেলে পৃথিবী উপকৃত হতে পারবে না। তারা মনে করেন, এশিয়ান ইকোনমিক জায়ান্ট চায়না থেকে শুরু করে দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়াকেও কয়লা নির্ভরতা থেকে সরে আসতে হবে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজ দেশেও হয়তো বাঁশখালীর মতো এমন প্রকল্প অনুমোদন করবে না চীন। 

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “ইআইএ বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে চীনা অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জেনেশুনে বাংলাদেশের এমন একটি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে, যা তারা হয়তো তাদের নিজের দেশেও অনুমোদন করবে না। তারা (চীনা প্রতিষ্ঠান) প্রকল্পটির ইআইএ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও এর যথার্থ আইনি কাঠামো যাচাই করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।” 

“একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও সমানভাবে এই দায় নিতে হবে, কারণ তারা এমন একটি প্রকল্পকে ছাড়পত্র দিয়েছে। এটা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের তদারকির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দেয়,” যোগ করেন তিনি। 

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের প্রধান বিশ্লেষক লরি মিলিভিরতা বলেন, “বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন প্রক্রিয়া বেশ কিছু পদ্ধতিগত সমস্যা উন্মোচন করে। বাংলাদেশে যে পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়ম–নীতিগুলো কার্যকর নয় তা পরিষ্কার।” 

তিনি বলেন, “স্পষ্টতই, চীন সরকার এবং এর রাষ্ট্রায়ত্ত অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেনি।” 

বাংলাদেশের বৈদেশিক দেনাবিষয়ক কর্মজোটের সদস্য সচিব ও জলবায়ুকর্মী হাসান মেহেদী অবশ্য মনে করেন বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইআইএ ‘লোক দেখানো,’ শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার জন্য এটা করা হয়েছে। 

শুরু থেকেই বিতর্কিত

নানা সহিংসতা ও অন্যান্য অনিয়মের কারণে বাঁশখালী বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে শুরু থেকেই একটি বিতর্কিত ও রক্তক্ষয়ী প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি অধিগ্রহণের ঘটনায় ২০১৬ সালে পুলিশের গুলিতে চারজন ও ২০১৭ সালে পৃথক সংঘর্ষে পুলিশের গুলেতে আরো একজন নিহত হয়েছিলেন। 

চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকল্পের বাংলাদেশি শ্রমিকেরা বেতন–ভাতা ও ওভারটাইমের দাবিতে বিক্ষোভ করলে পুলিশের গুলিতে পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরো দুই কর্মী। 

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগ্রুপ এস আলমের ৭০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে এসএস পাওয়ারে। এ ছাড়া চীনের সেপকো থ্রি ইলেকট্রিক পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন ২০ শতাংশ ও এইচটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের ১০ শতাংশ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। 

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রায় আড়াইশ’ কোটি ডলারের প্রকল্প। এর ৭০ শতাংশের বেশি ঋণ হিসেবে আসছে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক থেকে। 

প্রকল্পটিতে বর্তমানে প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি ও প্রায় এক হাজার চীনা শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালে নির্মাণাধীন প্রকল্পটির বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার কথা।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন