Follow us

করোনা সংকটে চীনের কাছে ৯ প্রকল্পের জন্য ৬০০ কোটি ডলার চেয়েছে বাংলাদেশ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-07-07
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার বনানীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে নির্মাণে কাজ করছেন শ্রমিকরা। এই অবকাঠামোটি নির্মাণ করছে চীনা সিনোহাইড্রো কোম্পানি। ৭ জুলাই ২০২০।
ঢাকার বনানীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে নির্মাণে কাজ করছেন শ্রমিকরা। এই অবকাঠামোটি নির্মাণ করছে চীনা সিনোহাইড্রো কোম্পানি। ৭ জুলাই ২০২০।
[কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ]

নতুন করে নয়টি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য চীনের কাছে ছয় শ কোটি (ছয় বিলিয়ন) ডলার সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। এসব প্রকল্পে অর্থ পাওয়ার জন্য ইতিপূর্বে চীনা অর্থায়নে নির্ধারিত ২৭টি প্রকল্প থেকে চারটি বাদ দেয়ার প্রস্তাব করেছে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ–ইআরডি।

মে মাসের ২১ তারিখে লেখা বাংলাদেশের নতুন প্রস্তাব সম্পর্কিত চিঠির একটি কপি বেনারনিউজের হাতে এসেছে। তবে সরকার অথবা চীন কোনো পক্ষ থেকেই এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে কর্মকর্তারা রাজি হননি।

নতুন প্রকল্পগুলো মূলত সড়ক, বন্দর ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ সম্পর্কিত। অর্থনীতিবীদদের মতে, অবকাঠামোগুলোর চীনা ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পের সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো পায়রা বন্দরের প্রথম ধাপের অবকাঠামো নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছে এক দশমিক ৬৬৮ বিলিয়ন ডলার।

এছাড়া বরিশাল-ভোলা সড়কে সেতু নির্মাণ প্রকল্পের জন্য এক দশমিক ২২৬ বিলিয়ন, বাংলাদেশের গ্রামীণ সড়কে উচ্চ প্রযুক্তির ব্রিজ নির্মাণে ৮০০ মিলিয়ন এবং নতুন জাহাজ ও মাদার ভেসেল কেনার জন্য ধরা হয়েছে ২৫০ মিলিয়ন ডলার।

চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিংপিং এর ২০১৬ সালে ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশকে ২৫ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় বেইজিং।

এব্যাপারে দুদেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। আলোচনার মাধ্যমে ২৭ প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি হয় চীন। বেশ কয়েকটি প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই ২৭ প্রকল্পের তালিকা বেনারের হাতে রয়েছে।

চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সহায়ক দেশ। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ পৌঁছায় ১.০৩ বিলয়ন ডলারে, যা ২০১৬ সালের মোট বিনিয়োগের ষোলো গুণ বেশি।

২০১৬ সালে চিহ্নিত ২৭টি প্রকল্পের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে বেনারকে জানান অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এশিয়া ডেস্কের যুগ্ম সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী।

প্রকল্পগুলো হলো: পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, ইনফোসরকার, কর্ণফুলি নদীর তলদেশে সুড়ঙ্গপথ নির্মাণ, ডবল পাইপলাইনের সাথে একক পয়েন্ট মুরিং নির্মাণ ও ঢাকা বিদ্যুত সরবরাহ কোম্পানি এলাকায় বিদ্যুত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্প।

এই পাঁচটি প্রকল্পের মোট ব্যয় ছয় বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি ধরা হয়েছে বলে জানান শাহরিয়ার কাদের।এছাড়া গত ৩০ জুন পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পপের জন্য ১.৩২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে পূর্বনির্ধারিত ২৭টি থেকে বাদ দেওয়া চারটি প্রকল্প হলো: ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্প, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প, বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের প্রি-পেইড মিটার প্রকল্প এবং কয়লা ভিত্তিক ৩৫০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র প্রকল্প।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনের কাছে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পগুলো সরকার অন্য উৎস থেকে বাস্তবায়ন করবে। এই চারটি প্রকল্প বাদ দিয়ে নতুন নয়টি প্রকল্প যোগ হলে বাংলাদেশে চীনের মোট প্রকল্পসংখ্যা দাঁড়াবে ৩২।

করোনাকালে ‘সরকারের অর্থ প্রয়োজন’

প্রতিশ্রুত ২৫ বিলিয়ন ডলারের আওতায় চিহ্নিত ২৭টি প্রকল্পের ক্ষেত্রে চীনের পক্ষ থেকে অর্থ ছাড়ের গতি শ্লথ বলে বেনারকে জানান বেসরকারি অর্থনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বেনারকে বলেন, “সেকারণে হয়তো বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে আরও নয়টি প্রকল্পের বিপরীতে ছয় বিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে।”

তাঁর মতে, করোনাভাইরাসের কারণে সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শ্লথ হয়ে গেলেও চীনারা বসে নেই। তারা তাদের অর্থ সহয়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে, “তারা মূলত তাদের বেল্ট অ্যাণ্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এগিয়ে নিতে কাজ করছে।”

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় বসে যাওয়াই চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের অর্থ চাওয়ার মূল কারণ বলে মনে করেনে ড. মোস্তাফিজুর।

তিনি বলেন, “সরকারের অর্থ প্রয়োজন। চীনা অর্থ দেশের অর্থনীতিতে গতি আনতে সহায়তা করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।”

প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পগুলো মূলত সড়ক, বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ সম্পর্কিত জানিয়ে ড. মোস্তাফিজ বলেন, “এগুলোকে চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পের সাথে কোনোভাবে সম্পর্কিত বলে ধরে নেয়া যায়।”

তবে “চীনা অর্থ গ্রহণের একটি ঝুঁকি আছে,” জানিয়ে ড. মোস্তাফিজ বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যারা চীনের কাছ থেকে বেশি অর্থ গ্রহণ করেছে, তারা ফাঁদে পড়েছে।”

এই বিপত্তি এড়ানোর জন্য চীনা অর্থ গ্রহণের সময় সঠিক প্রকল্প নির্বাচনসহ কয়েকটি বিষয় বাংলাদেশকে মাথায় রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

“প্রথমত, সুদের হার যেন কম হয়। দ্বিতীয়ত, গ্রেস পিরিয়ড যেন বেশি হয়। তৃতীয়ত, প্রকল্পের কেনাকাটায় যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকে,” বলেন ড. মোস্তাফিজ।

তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো “এখনও চূড়ান্ত হয়নি,” জানিয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এশিয়া ডেস্কের যুগ্ম সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী।

তাঁর মতে চূড়ান্ত না হওয়া প্রকল্প নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি হলে চীনের সাথে বাংলাদেশের “কূটনৈতিক সম্পর্কে সমস্যা হয়।”

“চীন আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যেসব বিষয় চূড়ান্ত হয়নি, সেসব বিষয় সম্পর্কে যেন আমরা না জানাই,” বেনারকে বলেন শাহরিয়ার কাদের।

এদিকে প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পগুলোতে অর্থ সহায়তার ব্যাপারে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ই-মেইলের জবাব পাওয়া যায়নি।

তবে সঠিকভাবে সময়ের মধ্যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে চীনা অর্থ গ্রহণে কোনো ঝুঁকি থাকার কথা নয় বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন শাহরিয়ার কাদের।

তিনি বলেন, “করোনাভাইরাসের মধ্যেও আমরা কিন্তু বসে নেই। প্রকল্প চলছে। দেশের উন্নয়নের জন্য আমাদের চীনা অর্থ প্রয়োজন আছে।”

এদিকে করোনা মহামারির মধ্যে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সহায়তা গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করেন বৈদেশিক সম্পর্কিত বেসরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির।

তিনি বলেন, “চীন আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। আমি এই সহায়তা নিতে আপত্তি দেখি না।”

“কেউ কেউ চীনের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য গ্রহণ করার কারণে বলছেন বাংলাদেশ চীনের কাছে চলে যাচ্ছে; ভারত ও পশ্চিমা দেশ থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। আসলে কথাটা ঠিক নয়,” বলেন হুমায়ূন কবির।

“প্রতিটি দেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক আলাদা। একটি আরেকটির পরিপূরক নয়,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “প্রতিটি দেশ তার স্বার্থ ও প্রাধান্য বিবেচনা করে বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণ করে থাকে। আমাদেরও উচিত সম্পর্কটি এই আলোকে নির্ধারণ করা।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট এক লাখ ৬৮ হাজার ৬৪৫ জন, এবং এই রোগে মারা গেছেন দুই হাজার ১৫১ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট এক কোটি ১৭ লাখ ১১ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন পাঁচ লাখ ৪০ হাজারের বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন