‘এক চীন’ নীতি সমর্থন তবে তাইওয়ান প্রশ্নে আলোচনায় সমাধান চায় বাংলাদেশ

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.08.04
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
‘এক চীন’ নীতি সমর্থন তবে তাইওয়ান প্রশ্নে আলোচনায় সমাধান চায় বাংলাদেশ বেইজিং এর মহাসড়কের পাশে বসানো বিশাল পর্দায় প্রচারিত তাইওয়ানের আশপাশে চীনা সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র মহড়ার সংবাদ। ৪ আগস্ট ২০২২।
[টমাস পিটার/রয়টার্স]

মার্কিন হাউস স্পিকার ন্যানসি পেলোসির তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সমর্থন কামনা করে চীনা রাষ্ট্রদূতের বিবৃতি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পরেই তাইওয়ান প্রশ্নে চীনকে সমর্থন করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।

তবে তাইওয়ান বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জাতিসংঘ সনদের আলোকে সমস্যা সমাধানেরও আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার বিকেলে দেয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ “এক চীন” নীতির প্রতি দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

একই দিন তাইওয়ানের উপকূলে পানিসীমায় চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে, মহড়ায় তাজা গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে চীন।

এই পরিস্থিতিতে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে তাইওয়ান প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জাতিসংঘ সনদের আলোকে এবং আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর বাংলাদেশ সফরের আগে এক-চীন নীতির প্রতি এই সমর্থন জানাল বাংলাদেশ।

আগামী শনিবার ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের জন্য ঢাকা সফর করবেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ.কে. আব্দুল মোমেনের সাথে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠক করবেন তিনি।

তাঁর এই সফরে বাংলাদেশের সাথে কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সময় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের আরও জোরালো ভূমিকা রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশে জোর দেবে বলে জানান তিনি।

ঢাকায় চীনা তৎপরতা

বুধবার ন্যানসি পেলোসির তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে তাইওয়ান উপকূলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ন্যানসি পেলোসির সফরের সময় মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ তাইওয়ানের কাছে প্রস্তুত রাখা হয়। সফরকালে মার্কিন স্পিকার বলেন, আক্রান্ত হলে তাইওয়ানকে ভুলে যাবে না আমেরিকা।

পেলোসির সফরকে কেন্দ্র করে তাইওয়ান উপকূলের কাছে সামরিক মহড়া শুরু করে চীনা সামরিক বাহিনী। চীন বৃহস্পতিবার তাইওয়ান উপকূলে মিসাইল ছুঁড়েছে এবং এর কিছু অংশ জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসে পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।

চীনের এই মিসাইল আক্রমণকে জাপান তাঁদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

এক-চীন নীতির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন চেয়ে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিবৃতি প্রকাশ করে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিংকে উদ্ধৃত করে দেয়া এই বিবৃতিতে বলা হয়, ন্যানসি পেলোসির তাইওয়ান সফর এক-চীন নীতির মারাত্মক লঙ্ঘন এবং এই সফর চীনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগলিক অখণ্ডতার প্রতি হুমকি।

এরপর দুপুরে চীনা দূতাবাসের উপ-প্রধান হুয়া লং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হাজির হয়ে মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের সাথে বৈঠক করে তাইওয়ান প্রশ্নে বাংলাদেশের সমর্থন কামনা করেন।

এরপরই বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক-চীন নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেয়া হয়।

চীন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী দেশ। বাংলাদেশের প্রায় সব উন্নয়ন প্রকল্প চীনা বিনিয়োগে অথবা চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

তবে দেশটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি চীন এবং বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ আটকে দিতে ভেটো দেয় দেশটি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় চীন সরকার। এরপর থেকে বাংলাদেশের প্রত্যেক সরকারই চীনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

তবে ২০০৪-০৫ সালে ঢাকায় তাইওয়ানের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি কার্যালয় খোলাকে কেন্দ্র করে বিএনপি সরকারের সাথে কূটনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হয় চীন সরকারের।

চীনা চাপের মুখে সেই কার্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় তখনকার সরকার।

গত বছর তাইওয়ানের একটি কোম্পানির কাছ থেকে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলার জন্য কিছু সামগ্রী নেয় বাংলাদেশ। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুই মন্ত্রী। এই ঘটনায়ও ক্ষুব্ধ হয় চীন।

এই ঘটনার কিছুদিন পর চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং সাংবাদিকদের কাছে অযাচিতভাবে মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশ যদি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক অথবা কোয়াডে যোগ দেয়, তাহলে দেশটির ক্ষতি হবে।

চীনা রাষ্ট্রদূতের এই মন্তব্যের পর সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে তিনি এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন।

চীন কেন এত তৎপর?

ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং এর নেতৃত্বে চীনের তৎকালীন স্বৈরশাসক চিয়াং কাইশেককে ক্ষমতাচ্যুত করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি।

প্রাণ বাঁচাতে তাইওয়ানে পালিয়ে যান চিয়াং কাইশেক ও তাঁর স্ত্রী।

সেই সময় তাইওয়ান দ্বীপ দখল করেনি চীনা কমিউনিস্টরা। তবে, তাইওয়ানকে বিদ্রোহী দ্বীপ হিসাবে বিবেচনা করে এর ওপর থেকে কখনওই মালিকানা ছাড়েনি বেইজিং।

পশ্চিমা দেশগুলো তাইওয়ানকে সমর্থন করে। ফলে তাইওয়ানে উন্নতমানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়। এটি অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তির দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নতমানের কম্পিউটার চিপস উৎপাদন করে তাইওয়ান।

চীনের বিরোধিতার কারণে জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনি তাইওয়ান। তবে দেশটি মোটামুটি স্বাধীন দেশের মতোই পরিচালিত হয়।

বেইজিং স্ব-শাসিত গণতান্ত্রিক দ্বীপটিকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসাবে বিবেচনা করে। দেশটি প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে মূল ভূখণ্ডের সাথে একত্রিত হতে এবং উচ্চ-স্তরের মার্কিন সফরে দৃঢ়ভাবে আপত্তি জানায়।

বেইজিংয়ের দাবিকৃত এক চীন নীতির অংশ হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে কূটনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না।  তবে তাইপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং আইন দ্বারা এটিকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দিতে বাধ্য।

পক্ষান্তরে চীন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে উন্নত হলেও সেখানে রয়েছে একদলীয় কমিউনিস্ট শাসন।

তবে তাইওয়ানের সফল গণতান্ত্রিক মডেল বেইজিংয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। চীন জানিয়েছে, তারা প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তাইওয়ান দখল করে নেবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।