ঢাকায় গার্ডার দুর্ঘটনা: চীনা কোম্পানির গাফিলতি প্রমাণ হলেও ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.09.07
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
ঢাকায় গার্ডার দুর্ঘটনা: চীনা কোম্পানির গাফিলতি প্রমাণ হলেও ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি ঢাকার উত্তরায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের গার্ডার চাপায় গাড়ি পিষ্ট হয়ে পাঁচজনের মৃত্যুর পর উদ্ধার কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। ১৫ আগস্ট ২০২২।
[বেনারনিউজ]

চীনা কোম্পানি চায়না গেজুয়া গ্রুপ কর্পোরেশনের গাফিলতির কারণে গত মাসে গার্ডার পড়ে পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনায় কোম্পানিটির সাথে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করার বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম. মনির হোসেন পাঠান।

তবে সরকার এখনও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সরকারি তদন্তে গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় দেশের প্রথম ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (ঢাকা বিআরটি) প্রকল্পের গার্ডার পড়ে দুই শিশুসহ পাঁচ ব্যক্তির প্রাণহানির জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না গেজুয়া গ্রুপ কর্পোরেশনকে দায়ী করার পর এখন কী ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথের পক্ষ থেকে এই কথা জানান প্রধান প্রকৌশলী।

এর আগে রোববার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়।

প্রতিবেদনের ব্যাপারে সড়ক সচিব এ.বি.এম. আমিন উল্লাহ নূরী বেনারকে বলেন, “মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার পড়ে পাঁচ ব্যক্তির মৃত্যুর জন্য চায়না গেজুয়া গ্রুপ কর্পোরেশনের অবহেলা দায়ী। এই কোম্পানি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়নি।”

তিনি বলেন, “এই কোম্পানিকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বার বার তাগিদ দেয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি কোম্পানিটি।”

সড়ক সচিব বলেন, “এই কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। প্রাণহানির দায়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। আমরা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুপারিশ করেছি।”

তবে মন্ত্রণালয় কী ধরনের শাস্তির সুপারিশ করেছে সেব্যাপারে কিছু জানাননি সড়ক সচিব।

যোগাযোগ করা হলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মনির হোসেন পাঠান বুধবার বেনারকে বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে চায়না গেজুয়া গ্রুপ কর্পোরেশনের সাথে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।”

তিনি বলেন, “এছাড়াও, এই কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এই কাজ করার এখতিয়ার এডিবি’র। আমরা এডিবি’র সাথে এ ব্যাপারে সভা করে যাচ্ছি।”

প্রসঙ্গত, এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

“সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং গার্ডার পড়ে নিহত পাঁচ ব্যক্তির বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি। এগুলো খুব সেনসিটিভ। সে কারণে সবকিছু বলা যাচ্ছে না,” বলেন মনির হোসেন পাঠান।

বিআরটি প্রকল্পের কাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে এবং চায়না গেজুয়া গ্রুপ কর্পোরেশন এখন সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, “সুরক্ষা ব্যবস্থা ভালো না হলে কাজ শুরু হবে না।”

এব্যাপারে জানতে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। অন্য দিকে এই দুর্ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এডিবির এক কর্মকর্তা।

শুরু থেকেই কোম্পানিটি মনোযোগী ছিল না

সরকারি হিসাবে, ২০২৫ সালের মধ্যে রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা হবে আড়াই কোটি। রাজধানীর ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমাতে ঢাকার অদূরে অবস্থিত গাজীপুর শহর সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরিত করে সরকার।

নতুন এই সিটির সাথে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ যানজটমুক্ত ও সহজতর করতে দেশের প্রথম বাস র‌্যাপিড প্রকল্প হাতে নেয়া হয়।

এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ২০১৩ সালে ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি গঠন করা হয়। সেই কাজ পায় চায়না গেজুয়া গ্রুপ কর্পোরেশন।

এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা থেকে বিমানবন্দরের সড়কের ওপর দিয়ে গাজীপুর পর্যন্ত একটি আলাদা উঁচু ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। গাজীপুর থেকে শুরু হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত এই সড়ক হবে প্রায় সাড়ে ২০ কিলোমিটার।

এই পথে কেবলমাত্র বাস চলাচল করবে। তিন থেকে পাঁচ মিনিট পর পর একটি করে উন্নতমানের বাস ছাড়বে। থাকবে ই-টিকেটিং ব্যবস্থা। ফলে যাত্রীদের সময় নষ্ট হবে না।

ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানির হিসাবে প্রতিদিন চার লাখ যাত্রী এই পথে চলাচল করবে।

তবে শুরু থেকেই কোম্পানিটি কাজে মনোযোগী ছিল না বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেছেন সাবেক সড়ক পরিবহন সচিব বেলায়েত হোসেন।

তিনি বলেন, “বিআরটি প্রকল্পে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমি সচিব হিসাবে ব্যক্তিগতভাবে কয়েকবার প্রকল্প এলাকা ঘুরে সেখানে সুরক্ষা ব্যবস্থা বৃদ্ধির কথা বলেছি। কিন্তু তারা আমাদের কথা কানে তোলেনি।”

“এরা কোনো ভালো কোম্পানি নয়। বার বার এই প্রকল্পে সুরক্ষা ঘাটতি দেখা গেছে,” বলেন বেলায়েত হোসেন।

বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পের কাজ ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু দফায় দফায় খরচ বৃদ্ধির পর বর্তমান খরচ চার হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইসাথে কাজের মেয়াদও বার বার বৃদ্ধি করা হয়।

দুর্ঘটনা আগেও ঘটেছে

এই প্রকল্পে সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বার বার।

গত ১৫ জুলাই প্রকল্পের গাজীপুর অংশে ক্রেন পড়ে এক শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। গতবছর ১৪ মার্চ প্রকল্পের উত্তরা অংশে আব্দুল্লাহপুরের কাছে একটি গার্ডার ভেঙ্গে পড়ে। ওই ঘটনায় আহত হন তিন চীনাসহ মোট ছয় শ্রমিক।

ওই ঘটনা তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

১৫ আগস্ট বিকালে পিলারের ওপর গার্ডার বসানোর সময় ওপর থেকে একটি গার্ডার নিচের সড়ক দিয়ে চলাচলকারী একটি প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে যায়।

ঘটনাস্থলেই দুই শিশুসহ মোট পাঁচ ব্যক্তি প্রাণ হারান। তাঁরা সকলেই বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন।

পাঁচ ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা হয়। এই মামলায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও কোনো চীনা নাগরিক আটক হননি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।