খায়রুজ্জামান আটক: মালয়েশিয়াকে অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.02.11
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
খায়রুজ্জামান আটক: মালয়েশিয়াকে অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ জেল হত্যা দিবসের ২২ বর্ষ পূর্তির এক অনুষ্ঠানে অন্যদের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৩ নভেম্বর ১৯৯৭।
[রয়টার্স]

‘ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ’ হওয়ার দায়ে আটকের কথা বলা হলেও বাংলাদেশের অনুরোধেই মালয়েশিয়া সাবেক বাংলাদেশি কূটনীতিক এম. খায়রুজ্জামানকে আটক করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।

“জেলহত্যার সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকায় খায়রুজ্জামানকে আটক করতে আমরা মালয়েশীয় সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম,” বেনারের প্রশ্নের জবাবে শুক্রবার বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় শরণার্থীর মর্যাদা ভোগ করলেও সরকার খায়রুজ্জামানকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাবে বলে জানান তিনি।

যদিও খায়রুজ্জামানকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কি না সে সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে কোনো ঘোষণা দেয়নি মালয়েশীয় সরকার।

এদিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে খায়রুজ্জামানের পরিণতি ভালো হবে না - এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো থেকে নিবৃত থাকতে মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে সেদেশের বেসরকারি সংস্থা লিবার্টি।

প্রসঙ্গত, ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও সেদেশে অবস্থান করায় খায়রুজ্জামানকে আটক করা হয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানিয়েছেন মালয়েশিয়া সরকারের এক কর্মকর্তা।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইন- ১৯৫৯/৬৩ এর ৫১(বি) উপধারা এবং ১৯৬৩ সালের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে তাঁকে আটক করা হয় বলে জানান তিনি।

শরণার্থী হলেও দেশীয় আইন প্রযোজ্য

বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার এক মানবাধিকার কর্মী খায়রুজ্জামানের ইউএনএইচসিআরের কার্ডের একটি ছবি টুইটারে শেয়ার করেছেন; যাতে কার্ডের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত লেখা আছে।

শরণার্থী হিসাবে খায়রুজ্জামানের অধিকারের ব্যাপারে জানতে বেনার নিউজের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে ইউএনএইচসিআর এর মুখপাত্র শুক্রবার জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক প্রথা অনুযায়ী, কোনো শরণার্থী অথবা রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া ব্যক্তিকে তাঁর নিজের দেশে ফেরত পাঠানো হয় না, যেখানে তাঁর জীবন অথবা স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তিনি জানান, কোনো দেশ ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন স্বাক্ষরকারী কি না তা বিবেচনা না করেই বলা যায় আন্তর্জাতিক এই চর্চা সকল দেশের জন্য বাধ্যতামূলক।

ইউএনএইচসিআর এর কার্ডধারী হওয়ার পরও পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে আটক করতে পারে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র জানান, শরণার্থীরাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আশ্রয়গ্রহণকারী দেশের আইন মানতে তাঁরা বাধ্য। কোনো শরণার্থী অপরাধ করলে দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতোই আইন প্রযোজ্য হবে।

আটকের পর থেকে খায়রুজ্জামানের অবস্থান নিয়ে কিছু জানায়নি মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ। তবে তিনি বর্তমানে সেদেশের অভিবাসন বিভাগের হাজতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

বুধবার মালয়েশিয়ার আমপাং, সেলাঙ্গর এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে খায়রুজ্জামানকে আটক করে দেশটির পুলিশ। সেখানে এক যুগের বেশি সময় ধরে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করে আসছিলেন তিনি।

আপিল করতে হলে সরকারকে ‘যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে

খায়রুজ্জামান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে হত্যা করে সেনাবাহিনীর একাংশ।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা নেন আওয়ামী লীগের নেতা ও বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তাঁর সরকারের আমলেই সে বছর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক জাতীয় চার নেতাকে ওই কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যা করে সেনাসদস্যরা।

তাঁরা হলেন, বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও পরবর্তীতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ও একই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান।

আওয়ামী লীগের অভিযোগ, এই জেল হত্যাকাণ্ডের সাথে খায়রুজ্জামান সংশ্লিষ্ট। তবে তিনি বরাবর এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

বঙ্গবন্ধু শাসন সমাপ্তির পর সেনাবাহিনী থেকে খায়রুজ্জামানের চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে সরকার।

আওয়ামী লীগের অভিযোগ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সামরিক শাসক এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানই খায়রুজ্জামানকে রক্ষার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে বিদেশ পাঠিয়ে দেন।

একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালের জুনে ক্ষমতায় এসে জেলহত্যার বিচার শুরু করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার। আটক হন খায়রুজ্জামান।

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে যায়। ক্ষমতায় আসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। জামিনে মুক্ত হন খায়রুজ্জামান।

২০০৪ সালে বিচারিক আদালতে জেলহত্যা মামলার রায়ে বেকসুর খালাস পান খায়রুজ্জামান। তবে, বিচারিক আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি তৎকালীন বিএনপি সরকার।

বিএনপি সরকার তাঁকে ফিলিপাইনে এবং ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসাবে নিয়োগ দেয়।

২০০৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে জয় লাভের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

২০০৯ সালেই খায়রুজ্জামানকে দেশে ফিরে আসতে নির্দেশ দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। তবে তিনি এই নির্দেশ না মেনে শরণার্থী হিসাবে মালয়েশিয়ায় থেকে যান।

এই অবস্থায় বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা সম্ভব কি না এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুক্রবার ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বেনারকে বলেন, “দেশের আইন অনুযায়ী কোনো বিচারিক আদালতের রায় প্রকাশ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। কিন্তু এই মামলার রায়ের পর প্রায় ১৮ বছর পার হয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “এই অবস্থায় এখন যদি সরকার বিচারিক আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে চায় সেক্ষেত্রে সরকারকে দেরি হওয়ার যৌক্তিক কারণ আদালতের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে। আদালত যদি সরকারের ব্যাখ্যা গ্রহণ করে কেবল তবেই এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে সরকার।”

খায়রুজ্জামানের শ্বশুর বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ বিরোধী ন্যাপ নেতা মশিউর রহমান যিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘যাদু মিয়া’ নামে পরিচিত।

খায়রুজ্জামানের স্ত্রী রিটা রহমান ২০১৮ সালে বিএনপির প্রতীকে সংসদ নির্বাচন করে হেরে যান।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মুজলিজা মুস্তাফা ও নিশা ডেভিড।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন