Follow us

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-02-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন নাহিদা সোবহান। ২৩ নভেম্বর ২০১৭।
ঢাকায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন নাহিদা সোবহান। ২৩ নভেম্বর ২০১৭।
[সৌজন্যে: আইওএম বাংলাদেশ]

মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম বাংলাদেশি নারী রাষ্ট্রদূত হিসেবে জর্ডানের আম্মান দূতাবাসের দায়িত্বগ্রহণ করছেন নাহিদা সোবহান (৫২)। শুক্রবার রাত নাগাদ তিনি সেখানে পৌঁছাবেন বলে ফোনে বেনারকে নিশ্চিত করেছেন দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।

“যেহেতু এখানে আমাদের নারী শ্রমিকের সংখ্যা অনেক, সেহেতু এখানকার সরকারি কর্তৃপক্ষসহ আমাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই নারী রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন,” বলেন তিনি।

“ম্যাডাম (নাহিদা সোবহান) আসার পর নারীদের সমস্যাগুলো আমরা আরো ভালো করে সামলাতে পারব,” বলেন মনিরুজ্জামান।

সৌদি আরবের পর জর্ডানেই সবচেয়ে বেশি নারী শ্রমিক পাঠায় বাংলাদেশ। দেশটির উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ার আগে থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনকে দেওয়া সাক্ষাতকারে নাহিদা জানান, কূটনীতিক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হবে ওই নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

জর্ডানে এখন এক লাখের বেশি বাংলাদেশি নারী শ্রমিক কাজ করছেন উল্লেখ করে তিনি দূতাবাসে নারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের কথাও জানিয়েছেন।

“আপাতত আমাদের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র আছে। ম্যাডাম আসার পর তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির কাজ শুরু হবে,” বলেন মনিরুজ্জামান।

প্রতিদিন আশ্রয় চান তিন-চার জন নারী

গত বছরের ৩ জুলাই আশ্রয়কেন্দ্র খোলার অনুমতি চেয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল আম্মান দূতাবাস। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে তিন-চার জন বাংলাদেশি নারী দূতাবাসে অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য আসছেন।

দূতাবাস আরো জানায়, নিয়োগকর্তার দুর্ব্যবহার, সময়মতো বেতন না পাওয়া, সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারাসহ নানারকমের অসুবিধার কারণে প্রবাসী নারী গৃহকর্মীরা দূতাবাসের শরণাপন্ন হন। শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়ও নিয়োগকর্তার বাসা, হাসপাতাল বা পুলিশ স্টেশন, জেলখানা থেকেও গৃহকর্মীদের দূতাবাসে পাঠানো হয়ে থাকে।

বর্তমানে তিন-চারজন নারী দূতাবাসের আশ্রয়ে আছেন উল্লেখ করে মনিরুজ্জামান জানান, অত্যাচারিত বা প্রতারিত হয়ে দূতাবাসে আশ্রয় নিতে আসা নারীর সংখ্যা ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় এখন অনেক কম।

“যতদিন আমাদের মেয়েরা এসে এখানে থাকবে, কাজ করবে; দুয়েকটি ঘটনা ঘটবেই। এর সংখ্যা হয়ত কমবেশি হবে। কিন্তু কখনোই এটা পুরোপুরি বন্ধ হবে না,” বেনারকে বলেন তিনি।

২০১৭ সালের জুলাই থেকে জর্ডানে কর্মরত এই কর্মকর্তার দাবি, জর্ডানে মূলত গার্মেন্টস ও গৃহস্থালি, এই দুটি ক্ষেত্রে কাজ করেন বাংলাদেশি নারীরা। এই দুই খাতে ৮০-৯০ হাজারের মতো নারী রয়েছেন।

মনিরুজ্জামান জানান, যেসব মেয়েরা পোশাক কারখানায় কাজ করেন, তাঁদের তেমন অভিযোগ নেই। কিন্তু বাসায় যাঁরা কাজ করতে আসেন, তাঁরা বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেন। এখানে যৌন নির্যাতনের চেয়ে মারধরের অভিযোগ বেশি পাওয়া যায়। বেশ কিছু আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

তিনি বলেন, “তবে এ জাতীয় ঘটনা আগের চেয়ে কমে গেছে।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ৩১ ডিসেম্বর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম বাংলাদেশি নারী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নাহিদা সোবহানকে আম্মান দূতাবাসের নিয়োগের কথা জানায়।

বাংলাদেশি অভিবাসীদের অধিকার রক্ষা সমিতির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বেনারকে বলেন, “সরকারের এই সিদ্ধান্তে আমরা খুবই আশাবাদী। কারণ তিনি খুবই দক্ষ কূটনীতিক। সেখানে আমাদের নারীদের কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, সে বিষয়গুলো সম্পর্কে তাঁর পরিস্কার ধারণা আছে।”

রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে নাহিদা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক ছিলেন উল্লেখ করে সাইফুল বলেন, “নারীদের সুরক্ষার জন্য যে আন্তর্জাতিক আইনগুলো রয়েছে, সেগুলোও তাঁর নখদর্পণে রয়েছে।”

“আমরা আশা করি তিনি এমন এক উদাহরণ তৈরি করতে পারবেন, যা অন্য কূটনীতিকরা অনুসরণ করতে করতে পারবেন,” যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের ৫০ জন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে মাত্র সাতজন নারী বলেও রয়টার্সকে জানিয়েছেন নাহিদা সোবহান। রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিজের নিয়োগকে লিঙ্গ সমতা রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টার দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

শুক্রবার হোয়াটসএ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে বেনারকে নাহিদা জানান, যাত্রাপথের মধ্যে থাকায় তিনি কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই।

দেশের ১৫তম বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের এই কর্মকর্তা আগে রোম, কলকাতা ও জেনেভায় অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার হিসেবে বাংলাদেশের অন্য যে নারী কূটনীতিকরা দায়িত্ব পালন করছেন তাঁরা হলেন: মরক্কোতে সুলতানা লায়লা, নেপালে মাশফি বিনতে শামস, যুক্তরাজ্যে সাঈদা মুনা তাসনীম, দক্ষিণ কোরিয়ায় আবিদা ইসলাম, ভিয়েতনামে সামিনা নাজ ও মরিশাসে রেজিনা আহমেদ।

এ ছাড়া ইসমাত জাহান বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) স্থায়ী পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঢাকা থেকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেসমিন পাপড়ি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন