আত্মসমর্পণ করা ইয়াবা কারবারিদের সাজা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কামরান রেজা চৌধুরী ও সুনীল বড়ুয়া
2022.11.23
ঢাকা ও কক্সবাজার
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
আত্মসমর্পণ করা ইয়াবা কারবারিদের সাজা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারের টেকনাফে আলোচিত ১০১ আত্মস্বীকৃত ইয়াবা কারবারির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিকে আদালত থেকে বের করে নিয়ে আসা হচ্ছে। ২৩ নভেম্বর ২০২২.
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

বাংলাদেশে প্রথম দফায় আত্মসমর্পণ করা ১০১ জন ইয়াবা ও অস্ত্র চোরাকারবারির জেল-জরিমানা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

বুধবার তিনি বেনারকে বলেন, “আমরা বলেছিলাম যে আত্মসমর্পণ করলে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে না। আমি বুঝতে পারছি না কেন সাজা হলো।

আমরা হয়তো মামলাটির দিকে প্রয়োজনীয় নজর দিতে পারিনি বিধায় সাজা হয়েছে,” বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “সুন্দরবনের জলদস্যুরা অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মহেশখালীতে অপরাধীরা আত্মসমর্পণ করেছে; তাদেরও কিছু হয়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে বলে জানান তিনি।

সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলার টেকনাফে আত্মসমর্পণ করা ১০১ ইয়াবা কারবারিকে মাদক মামলায় দেড় বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। তবে দায়ের করা অস্ত্র মামলা থেকে তাঁদের খালাস দেওয়া হয়েছে।

বুধবার দুপুরে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল এই রায় ঘোষণা করেন বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ফরিদুল আলম।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি শুরু হওয়া সরকারের মাদকবিরোধী অভিযান থেকে বাঁচতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন এসব মাদক ও অস্ত্র কারবারি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মাদক মামলায় একসাথে এত সংখ্যক আসামির সাজা এটিই প্রথম। দেশটির মাদক আইনে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। অস্ত্র আইনেও রয়েছে কঠোর শাস্তির বিধান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সাজা সরকারের প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ এবং এর ফলে ভবিষ্যতে আর কেউ সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা রেখে আত্মসমর্পণ করবে না।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মাদকবিরোধী ওই অভিযান ব্যর্থ হয়েছে এবং আত্মস্বীকৃত ওই মাদক কারবারিদের এই সুবিধা দেয়া উচিত হয়নি। বুধবার রায় ঘোষণার সময় ১৭ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন, বাকিরা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আগে থেকেই পলাতক রয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নূর খান বুধবার বেনারকে বলেন, “সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সেটি ঠিক আছে। অভিযানে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। তবু মাদক বন্ধ হয়নি, হবেও না। মাদক বন্ধ করতে সামাজিক শক্তিগুলোকে নিয়ে করতে হবে। সেটি সরকার করেনি।

তিনি বলেন, “সরকার বলেছিল, আত্মসমর্পণ করলে সাজা হবে না। কিন্তু সাজা হলো। এর ফলে সরকারের কথার ওপর আর কেউ আস্থা রাখবে না। আর কেউ আত্মসমর্পণ করবে না।

নূর খান বলেন, “মূলত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে প্রাণ বাঁচাতেই তাঁরা আত্মসমর্পণ করেছিল। এরা জামিন পেয়ে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ আবার মাদক ব্যবসায় যুক্ত হয়।

আদালত যা বলেছে

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল আলম বেনারকে বলেন, “রায়ে বিচারক বলেছেন মামলার বাদী, সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তা কেউই আসামিদের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে দায়ের করা দুটি পৃথক মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনা ও অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি। এ কারণে আসামিদের মামলা দুটি থেকেই বেকসুর খালাস প্রদান করা যেতে পারে।

বিচারককে উদ্ধৃত করে পিপি বলেন, “কিন্তু আসামিরা যেহেতু ইয়াবার পৃষ্ঠপোষক, গডফাদার, পাচারকারী ও কারবারি হিসাবে আত্মস্বীকৃত তাই তাদের বেকসুর খালাস প্রদান করা হলে সমাজে খারাপ বার্তা যাবে। তাই তাদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হলো।

আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশের পরিকল্পনায় অস্ত্র ও ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়।

ইয়াবার ভয়াবহতা ও মাদক বিরোধী অভিযান

উৎপাদনকারী না হয়েও বাংলাদেশ মাদক অপব্যবহারের শিকার। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করে যা দেশের যুব সমাজকে ধ্বংস করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত থেকে আসা ফেনসিডিল ছাড়াও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ইয়াবা নামক এমফিটামিন ট্যাবলেট যা অনেকটা মহামারি পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশে যে পরিমাণ ইয়াবা প্রবেশ করে তার অধিকাংশই আসে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা সীমান্ত দিয়ে।

অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে সারাদেশে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আট লাখ ১২ হাজারের বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট আটক করেছে। ২০২১ সালে আটক করা হয় পাঁচ কোটি ৩০ লাখের বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে প্রবেশ করা ইয়াবার প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। তাঁদের মতে, যে পরিমাণ ইয়াবা আটক হয় তা প্রকৃত সংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ।

মাদকের ভয়াবহতা থেকে জনগণকে রক্ষা করতে অনেকটা ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি দুদার্তো রদ্রিগের মতো বাংলাদেশেও মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে শেখ হাসিনার সরকার। ২০১৮ সালের ২৬ মে টেকনাফে উপজেলার পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক র‌্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর পুরো অভিযান প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবে তা চলমান থাকে।

র‌্যাব ছাড়া টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধেও অভিযুক্ত মাদক কারবারিদের হত্যার অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী। সরকার মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানায়।

উৎসাহিত হবে ইয়াবা পাচারকারীরা

২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টায় কক্সবাজারের টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের হাতে ইয়াবা ও অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। তাদের সকলের বিরুদ্ধে মাদক এবং অস্ত্র মামলা করা হয়। কিছুদিন পর সবাই জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসে।

কক্সবাজার সুশীল সমাজের নেতা ফরহাদ ইকবাল বেনারকে বলেন, “এসব ইয়াবা কারবারি স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কথা বলে আত্মসমর্পণ করলেও পরবর্তীতে জামিনে বেরিয়ে এসে কেউ কেউ আবার ইয়াবা ব্যবসায় শুরু করে।” তিনি মনে করেন, এ ধরনের রায়ের মাধ্যমে ইয়াবা কারবারিরা আরও উৎসাহিত হবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।