বাঁশের সাঁকোতে সাংসদ: ছবি নিয়ে ‘কটাক্ষ’ করায় কুমিল্লায় আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে ডিজিটাল আইনে মামলা

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.02.04
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
বাঁশের সাঁকোতে সাংসদ: ছবি নিয়ে ‘কটাক্ষ’ করায় কুমিল্লায় আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে ডিজিটাল আইনে মামলা ঢাকার শাহবাগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিরোধী এক সমাবেশে টানানো প্ল্যাকার্ড। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১।
[শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শুধু সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাই নয়, এবার সমালোচিত ওই আইনে মামলার শিকার হয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।

নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা আইনটি প্রণয়নের পর থেকেই এর কালো ধারাগুলো বাতিলের দাবি জানানোর পাশাপাশি আইনটি অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন।

কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলায় এমন একটি ঘটনা ঘটেছে গত মঙ্গলবার, যেখানে সরকার দলীয় সাংসদের মতামত নিয়ে একই দলের তিন নেতার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের হয়েছে। বিষয়টি বেনারের কাছে নিশ্চিত করেছেন হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কায়েস আকন্দ।

স্থানীয় যুবলীগ নেতা খবির খান, মো. আসাদ খন্দকার ও গাজী তানভীরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি করেন হোমনা-তিতাস আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ সেলিমা আহমাদের সমর্থক ও আরেক যুবলীগ নেতা রোবেল আহম্মেদ।

এই মামলার প্রতিবাদে ও প্রত্যাহারের দাবিতে বৃহস্পতিবার হোমনা থানায় অবস্থান নেন স্থানীয় শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।

পুলিশের প্রতি তাঁদের দাবি ছিল, হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা হোক, নতুবা তাঁদের সবাইকে কারাগারে পাঠানো হোক।

অধিকার কর্মীদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কারও জন্য নিরাপদ নয়। এটি সম্পূর্ণ বাতিল অথবা সংশোধন করা উচিত।

একটি নিবর্তনমূলক আইন

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বেনারকে বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে। এটি একটি নিবর্তনমূলক আইন। চাইলে যে কেউ আইনটির অপব্যবহার করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষমতাবান লোকদের জন্য আইনটির অপব্যবহার খুবই সহজ।”

তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় ২০২১ সালে শুধু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই এক হাজার ১৩৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেগুলোর প্রায় সবই ‘হয়নারিমূলক’।

নূর খান বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি বিরোধীদলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছিল। তবে হোমনার ঘটনা থেকে আমরা জানলাম, ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা তাদের নিজের দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি প্রয়োগ করছেন।”

“বিরোধী দল হোক অথবা নিজের দলের হোক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা ইচ্ছা করলেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি ব্যবহার করতে পারে,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা বারবার এ কথা বলে আসছি। আইনটি বাতিল করা হোক।”

“ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি দেশে সাংঘাতিক অবস্থা সৃষ্টি করেছে,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, “এই আইনটি যেভাবে অপব্যবহার করা হচ্ছে তাতে সরকারের উচিত এটিকে সংশোধন করা, যার মাধ্যমে এর অপব্যবহার রোধ করা যায়।”

“এখানে রাষ্ট্র, সরকার, দল-সবকিছু এক করে দেখা হয়। সেকারণে কোনো কিছু লিখলেই সেটিকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লেখা হয়েছে বলে আখ্যায়িত করা হয় এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় মামলা করা হয়.” যোগ করেন তিনি।

মামলার পেছনে ‘বাঁশের সাঁকো

সাংসদ সেলিমা আহমাদ শুক্রবার বেনারকে বলেন, “আমি, হোমনা পৌরসভার মেয়র ও হোমনা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান কয়েকদিন আগে একটি বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে হোমনা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ইসলামপুরে যাই। সেখানকার অধিবাসীরা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি করেন। আমি তাদের আশ্বাস দেই যে, সেতুটি নির্মাণ হবে।”

তিনি বলেন, “কিন্তু আমার সাঁকোর ওপর দিয়ে পার হওয়ার ছবিকে কেন্দ্র করে খবির খানসহ অন্যান্যরা ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে এবং দিয়ে যাচ্ছে। আমাকে দুর্নীতিবাজ বলা হয়েছে।”

“আমি কি দুর্নীতিবাজ? আমাকে অযোগ্য বলতে পারে। কিন্তু কেন আমাকে দুর্নীতিবাজ বলবে? সেকারণে আরেক যুবলীগ নেতা মামলাটি করেছেন; আমি করিনি.” বলেন সেলিমা আহমাদ।

তবে বেনারের হাতে আসা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রোবেল স্থানীয় সাংসদের সাথে আলোচনা করে তাঁর অনুমতি নিয়েই মামলাটি করেছেন।

মামলাকারী আওয়ামী লীগ নেতা রোবেল আহম্মেদ এজাহারে বলেন, ৩১ জানুয়ারি হোমনা-তিতাস আসনের এমপি সেলিমা আহমাদ সাঁকোর ওপর দিয়ে তিতাস নদী পার হয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম ইসলামপুর যান। তখন সাংসদের সাথে ছিলেন হোমনা পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম ও হোমনা উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান মো. মহসিনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

“সাংসদ এলাকার অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন,” উল্লেখ করে এজাহারে বলা হয়, আসামি খবির খান, মো. আসাদ খন্দকার ও গাজী তানভীর সাংসদ সেলিমা আহমাদসহ সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ সহ্য করতে পারে না এবং তাঁর স্থানীয় অনুসারীদের প্রায় সময়ই ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে থাকে।

আসামিরা সাংসদের সাঁকো পার হওয়ার ছবিকে ‘অপমানমূলকভাবে কটাক্ষ’ করে তাঁর প্রতি ‘বিদ্বেষসৃষ্টি করতে এবং এলাকায় ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকে জনগণের কাছে হেয় প্রতিপন্নকরার জন্য ফেসবুকে পোস্ট দেন বলে অভিযোগ করা হয় এজাহারে।

এজাহারে রোবেল উল্লেখ করেন, খবির খান পোস্টে বলেন, “হোমনা টু গৌরিপুর রাস্তাটির বেহাল অবস্থা, জনগণের ভোগান্তির শেষ নেই। আর কতিপয় দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধি ও নেতাকর্মীরা আছেন সাকো নিয়ে। হায়রে হোমনা-তিতাস।”

মামলা তদন্ত করছে পুলিশ

হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কায়েস শুক্রবার বেনারকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হওয়ার পর হোমনার স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও তাঁদের কর্মীরা গতকাল থানায় এসেছিলেন। তাঁরা প্রায় ঘণ্টা খানেক থানায় অবস্থান করেন। তাঁরা বলছিলেন, মামলা তুলে নেয়া হোক অথবা তাঁদের সবাইকে কারাগারে পাঠানো হোক।

তিনি বলেন, “আমি বলেছি, আমরা তদন্ত করে দেখছি। যদি কোনো সত্যতা না থাকে তাহলে আসামিদের কিছুই হবে না। আর সত্যতা থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

আবুল কায়েস বলেন, “আমরা গত মঙ্গলবার মামলাটি গ্রহণ করে তদন্তের জন্য দিয়েছি। তদন্ত চলছে।”

হোমনা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল মজিদ বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলা করার প্রতিবাদে আমরা আওয়ামী লীগের নেতারা সবাই হোমনা থানায় যাই। আমাদের সরকারের সময় আমাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হবে-এটা চলবে না।”

তিনি বলেন, “প্রয়োজনে আমরা এই মামলার প্রতিবাদে কর্মসূচি দেবো।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন