উন্নয়নের রাজনীতি: এক দিনে প্রধানমন্ত্রীর ১০০ সেতু উদ্বোধন

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.11.07
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
উন্নয়নের রাজনীতি: এক দিনে প্রধানমন্ত্রীর ১০০ সেতু উদ্বোধন সুনামগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর ওপর নির্মিত রানীগঞ্জ সেতুর ওপর হাঁটছেন দর্শনার্থীরা। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করা একশ’ সেতুর মধ্যে ৭০০ মিটার থেকে কিছু বেশি দৈর্ঘ্যের এই সেতুটিই দীর্ঘতম। ৭ নভেম্বর ২০২২।
[বেনারনিউজ]

সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধী দল বিএনপির আন্দোলনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার এক সাথে দেশের ২৫ জেলায় একশ’ সেতু ও কালভার্ট উদ্বোধন করেছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উন্নয়নের রাজনীতি প্রচারে এসব প্রকল্প সহায়তা করবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

এর আগে রোববার গাজীপুর থেকে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত দশ বছর ধরে নির্মাণাধীন বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ফ্লাইওভারের একাংশ যানবাহনের জন্য খুলে দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

আর গত ২৫ জুন খুলে দেয়া হয় দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতু, যার মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন হয়েছে। এছাড়া চালু হয়েছে নড়াইলে কালনা সেতু। আগামী ডিসেম্বরের শেষভাগে রাজধানীতে মেট্রোরেলের একাংশ চালু করার প্রস্তুতি চলছে।

সরকারি দলের নেতারা বলছেন, ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চালু করার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে আওয়ামী লীগের অর্জন তুলে ধরার কৌশল নিয়েছে দলটি।

যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন প্রচার করে আগামী নির্বাচনে সুবিধা করা কঠিন হবে।

এদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশের মাধ্যমে সরকার পতনের আন্দোলন বেগবান করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সর্বশেষ শনিবার বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশের আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, দেশে গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো হবে। আওয়ামী লীগের উন্নয়নের রাজনীতিকে ‘ধোঁকাবাজি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।

একশ’ সেতু উদ্বোধন

সোমবার ভার্চুয়ালি গণভবন থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা একশ সেতু যানবাহনের জন্য খুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসব সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ৮৮০ কোটি টাকা।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেতুগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার, যার মধ্যে দীর্ঘতমটি হচ্ছে সুনামগঞ্জের কুশিয়ারা নদীর ওপর ৭০২ মিটার থেকে কিছু বেশি দৈর্ঘ্যের রানীগঞ্জ সেতু।

বিভাগ হিসাবে সেতুগুলোর মধ্যে ৪৬টি চট্টগ্রামে, ১৭টি সিলেটে, ১৪টি বরিশালে, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগে সাতটি করে, ময়মনসিংহে ছয়টি এবং রংপুর বিভাগে রয়েছে তিনটি সেতু। 

মোট একশ সেতুর মধ্যে জেলা হিসেবে ৪২টি পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলায় অবস্থিত বলে বেনারকে জানিয়েছেন জেলার সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ আল নূর সালেহীন।

তিনি বলেন, এর মধ্যে সবচেয়ে বড়োটি হচ্ছে ১৪৩ মিটার লোগান সেতু। সেতুটি চেঙ্গির একটি শাখা নদীর ওপর নির্মিত।

মাহমুদ আল নূর বলেন, এই অঞ্চলে লোহার বেইলি ব্রিজ ছিল। সেগুলো ভেঙে স্থায়ী কংক্রিট সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষের অনেক সুবিধা হবে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এই একশ সেতু উদ্বোধনের ফলে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। পাশাপাশি এই সেতুগুলো দুর্যোগ মোকাবিলায় বড়ো ভূমিকা রাখবে বলে তিনি জানান।

নির্বাচনী প্রচারের অংশ

আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খান সোমবার বেনারকে বলেন, একশ’ সেতু উদ্বোধন মূলত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারের একটি অংশ।

তিনি বলেন, পদ্মা সেতু, কালনা সেতুসহ দেশের রাস্তাঘাট, অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন করেছে বর্তমান সরকার। আরও অনেক উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।

“এই কাজগুলো আগামী নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নেয়ার জন্যই হাতে নেয়া হয়েছে। আগামী নির্বাচনে আমাদের অন্যতম কৌশল হবে বর্তমান সরকারের আমলে যেসব উন্নয়ন হয়েছে সেগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা,” বলেন শাজাহান খান।

তাঁর মতে, “দেশের মানুষ আমাদের সময়ে যেসব উন্নয়ন হয়েছে সেগুলো বিবেচনা করে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আসতে ভোট দেবে।”

নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করবে ‘দুর্নীতি’

উন্নয়ন প্রকল্পকে নির্বাচনের প্রধান প্রচার কৌশল হিসাবে নিলে, তা হয়তো কাজ করবে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার।

তিনি সোমবার বেনারকে বলেন, “রাস্তা, ব্রিজ নির্মাণ করা হলে মানুষ উপকৃত হয়, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই বিবেচনায় দল ক্ষমতায় আসবে-এই চিন্তা ঠিক নাও হতে পারে।”

আশির দশকে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ বিরোধী দলের আন্দোলনকে গ্রাহ্য না করে অবকাঠামো উন্নয়নের কথা জনগণের সামনে তুলে ধরতেন জানিয়ে তিনি বলেন, “তবে তাতে খুব একটা কাজ হয়নি।”

প্রসঙ্গত, ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে সরকার গঠনের পর জনগণের সামনে উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরত বিএনপি সরকার। আর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে “উন্নয়নের গণতন্ত্র” নামক একটি ধারণার অবতারণা করে আওয়ামী লীগ।

গত ১৪ বছরে বাংলাদেশে কয়েকটি বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার যেগুলোর বেশিরভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে; অন্যগুলো বাস্তবায়নাধীন।

ড. শান্তনুর মতে, আগামী নির্বাচনে “মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন দুর্নীতি নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করবে।”

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, কোনো একটি বৃহৎ প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি হলে সাধারণ মানুষের কিছু যায় বা আসে না। তারা এই বিষয়ে মাথা ঘামায় না। কারণ এই দুর্নীতি তাঁদের সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে না।

“তবে সামান্য বয়স্ক ভাতা পাওয়া একজন দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে কোনো সরকারি কর্মচারী অথবা প্রভাবশালী ব্যক্তি যখন ঘুষ আদায় করে, তখন সেটি মানুষকে ক্ষুব্ধ করে,” বলেন তিনি।

“সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের সরকারি অফিসগুলো থেকে আমরা এই ধরনের নিম্ন স্তরের দুর্নীতি দূর করতে পারিনি। আর এগুলো নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে,” যোগ করেন ড. শান্তনু।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।