নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন: ক্ষমতাসীনদের হঠাৎ উদ্যোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন

আহম্মদ ফয়েজ
2022.01.18
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন: ক্ষমতাসীনদের হঠাৎ উদ্যোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট দিয়ে বের হয়ে আসছেন দুই নারী। ছবিটি দেওভোগ আখড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে তোলা। ১৬ জানুয়ারি ২০২২।
[ফোকাস বাংলা]

নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সংলাপ শেষ হওয়ার দিনই সোমবার কমিশন গঠনে একটি আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ৩২টি রাজনৈতিক দল আমন্ত্রণ পেলেও এই সংলাপকে ‘অর্থহীন’ দাবি করে তাতে যোগ দেয়নি বিরোধী দল বিএনপিসহ সাতটি দল।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের অব্যাহত দাবির মুখে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বেনারকে বলেন, “বহুল প্রত্যাশিত একটি আইন প্রণয়নের কাজ কারো সাথে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা ছাড়াই যে প্রক্রিয়ায় শুরু হয়েছে তা হতাশাজনক।”

“রাষ্ট্রপতির সংলাপের শেষ দিনেই আইনের খসড়াটি যেভাবে অনুমোদন পেল তাতে মনে হচ্ছে ক্ষমতাসীনরা এখানে একটি রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের চেষ্টা করল।” 

বিএনপি রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ না নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শুধু বিএনপি নয়, বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সংলাপে যায়নি। হয়তো তাদের অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয় বলেই তারা যায়নি।” 

“এর আগেও সংলাপের মাধ্যমে বিদায়ী কমিশন গঠন করা হয়েছিল, যে কমিশন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে,” মন্তব্য করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ প্রসঙ্গে বেনারকে বলেন, “ইসি গঠনের চেয়ে বিএনপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা। সেটি যতক্ষণ নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ এ ধরনের সংলাপ, কমিশন বা আইন করে কিছু হবে না।” 

মন্ত্রিসভায় আইন অনুমোদন

একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে তার সুপারিশের আলোকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেয়ার বিধান রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই খসড়া আইনটির অনুমোদন দেয়া হয়। এর নাম ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২।

সময় স্বল্পতার কারণে এখনই নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়; বেশ কিছুদিন ধরে সরকার এমন দাবি করলেও হঠাৎ করেই আইন করার এই উদ্যোগকে বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই বৈধতা দেয়ার প্রয়াস হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। 

সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন গঠনের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। সংবিধানে এ বিষয়ে আইন করার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারই আইন করেনি। এতদিন রাষ্ট্রপতি সরাসরি নির্বাচন কমিশন গঠন করে দিতেন। রাষ্ট্রপতি বিগত দুটি কমিশন গঠন করেছেন অনুসন্ধান কমিটি গঠনের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। 

সোমবার সচিবালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “অনুসন্ধান কমিটিতে এক নম্বরে থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, তিনি কমিটির চেয়ারম্যান হবে। এরপর থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, কম্পট্রলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল, পিএসসির চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দু-জন বিশিষ্ট নাগরিক। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কমিটিতে সাচিবিক সহায়তা দেবে।” 

খসড়া আইনটি ব্যাখ্যা করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে গঠিত একটি অনুসন্ধান কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে যোগ্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করবে।

সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের বাংলাদেশের নাগরিক ও কমপক্ষে ৫০ বছর বয়স্ক হতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন তাঁদের “কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, আধা-সরকারি বা বেসরকারি বা বিচার বিভাগীয় পদে কমপক্ষে ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।” 

এই খসড়া আইনটি “সংসদের চলতি অধিবেশনেই” পাশ করার চিন্তা রয়েছে বলে সোমবার পৃথক এক সংবাদ সম্মেলনে জানান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। 

‘কোনো কার্যকর উদ্যোগ নয়’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বেনারকে বলেন, “এই উদ্যোগের মাধ্যমে কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হচ্ছে না বরং অতীতের কমিশনগুলোকে বৈধতা প্রদানের এক আশ্চর্যজনক প্রচেষ্টা বলে মনে হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “অতীতেও এ ধরনের অনুসন্ধান কমিটি ছিল, এখনও হবে। যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়গুলো পরিষ্কার না।”

এদিকে এক বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদনকে ‘আশাব্যঞ্জক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে খসড়াটি “অবিলম্বে সকলের জন্য উন্মুক্তকরার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

এতে বলা হয়, “সাংবিধানিক অঙ্গীকারের প্রতিফলক এ ধরণের জনগুরুত্বপূর্ণ একটি আইন পাশের পূর্বে পূর্ণাঙ্গ যাচাই বাছাইসহ নাগরিক সমাজ তথা সকল অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।” 

তবে এই আইনের মাধ্যমে “মানুষের প্রত্যাশিত নির্বাচন কমিশন গঠন সম্ভব হবে না। বরং ক্ষমতাসীনরা যেভাবে চান, সেটিই এখন আইনি ভিত্তি নিয়ে করার সুযোগ তৈরি করবে,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন