Follow us

অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মচারী গ্রেপ্তার করা যাবে না

পুলক ঘটক
ঢাকা
2018-10-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৪ অক্টোবর ২০১৮।
জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৪ অক্টোবর ২০১৮।
সৌজন্যে: বাসস

সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীরা ফৌজদারি অপরাধ করলে তাঁদের গ্রেপ্তারের আগে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়ার বিধান রেখে ‘সরকারি চাকরি বিল-২০১৮’ বুধবার জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

আইনে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে হলে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

১৯৬৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা অনুযায়ী, দুদক অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়েও যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে। ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৫ ধারায় এ বিধান বলবৎ রাখা হয়েছে। কিন্তু নতুন আইনটি কার্যকর হলে ওই সব বিধান সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

ফলে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। গ্রেপ্তার করতে হলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বেনারকে বলেন, “একই ধরনের বিধান রেখে এর আগে দুদকের আইনটি সংশোধন করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের সুবিধা দেওয়ার সেই বিধানটি হাইকোর্টের রায়ে অবৈধ এবং বাতিল হয়ে গেছে। সরকার হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও করেনি।”

“এ রকম অবস্থায় সংসদে একই বিধান পাস করা দুঃখজনক,” বলেন দুদকের ওই আইনজীবী।

উল্লেখ্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, আইন ও সালিস কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্টজনেরা সরকারি কর্মচারীদের ফৌজদারি অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার বিধান বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বেনারকে বলেন, “এরপর কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী দুর্নীতি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়লেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারবে না, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”

“এ আইনটির ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হবে এবং দুর্নীতি নিরোধ সংক্রান্ত অন্যান্য আইনগুলোও অকেজো হয়ে যাবে। এভাবে আইনটি পাস করা একটি হতাশাব্যঞ্জক। এটি সরকারের জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়,” বলেন তিনি।

আইনটি পাসের তীব্র বিরোধিতাকারী জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মিলন বেনারকে বলেন, “এই বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, সংবিধানে বলা হয়েছে, সব নাগরিক সমান। কিন্তু এই আইনে একটি শ্রেণিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।”

তিনি প্রশ্ন রাখেন, “সরকারি কর্মকর্তারা ঘুষ খেতে পারবেন, দুর্নীতি করতে পারবেন, কেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না?”

বুধবার সংসদে বিরোধী দলের ১১ জন সদস্য আইনটির এই বিধানের বিরোধিতা করে বক্তব্য দিলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক আইনটি পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।

অন্য কয়েকটি বিধান

আইনে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে জনবল নিয়োগ হবে মেধা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। তবে সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণ করতে সরকার ‘পদ সংরক্ষণ’ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

অর্থাৎ, নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশ যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা যাবে।

আইনে সরকারকে, সরকারি গেজেট আদেশ দ্বারা প্রজাতন্ত্রের যে কোনো কর্ম বা কর্ম বিভাগ সৃজন, সংযুক্তকরণ, একীকরণ, বিলুপ্তিকরণসহ অন্য যে কোনোভাবে পুনর্গঠন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

কোনো বিদেশি নাগরিককে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত করা যাবে না মর্মে বিধান রাখা হয়েছে এই আইনে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেবা গ্রহণকে কোনো অর্থেই প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বলে গণ্য করা যাবে না।

আইনের ৩২ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের লঘু ও গুরুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। লঘু শাস্তির মধ্যে রয়েছে, তিরস্কার, পদোন্নতি বা বেতন স্থগিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষতিপূরণ আদায়। গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর, অপসারণ ও চাকরি হতে বরখাস্ত করা।

কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় মৃত্যুদণ্ড বা এক বছর মেয়াদের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে রায় দেওয়ার দিন থেকে চাকরি থেকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত হবেন।

তবে কর্মচারী এক বছর বা তার কম মেয়াদের জন্য দণ্ডিত হলে কর্তৃপক্ষ লঘুদণ্ড দেবেন।

প্রজাতন্ত্রের কর্ম হতে বরখাস্ত হয়েছেন, এমন কোনো ব্যক্তি ভবিষ্যতে প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মে বা রাষ্ট্রের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।

তবে এই আইনে যা–ই থাক না কেন, রাষ্ট্রপতির কাছে সন্তোষজনক মনে হলে তিনি সাজা পাওয়া ব্যক্তিকে অব্যাহতি প্রদান করতে পারবেন এবং চাকরিতে পুনর্বহাল করতে পারবেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন