সংকটের ভেতর গ্যাস উৎপাদনে সুখবর, যদিও ঘাটতি মিটবে না

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.05.02
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
সংকটের ভেতর গ্যাস উৎপাদনে সুখবর, যদিও ঘাটতি মিটবে না গ্যাস বন্ধ, তাই বাড়ির ছাদে ইটের চুলা বানিয়ে কাগজ ও খড়কুটা দিয়ে রান্না করছে ঢাকার একটি পরিবার। ৩ মার্চ ১৯৯৮।
[রয়টার্স]

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে সুখবর দিয়েছেন জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

সোমবার ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে তিনি জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের কৈলাশটিলার সাময়িকভাবে বন্ধ সাত নম্বর কুপ সংস্কার করে প্রায় দুই কোটি ঘনফুট গ্যাস আবিষ্কার হয়েছে।

আগামী ১০ মের মধ্যেই বাড়তি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযোজন করা সম্ভব হবে বলে বেনারকে জানান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, এই বাড়তি গ্যাস দৈনিক ঘাটতির প্রায় এক তৃতীয়াংশ মেটাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে বিশ্বজুড়ে গ্যাসের দাম বেসামাল হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রের সাময়িক বন্ধ (সাসপেনডেড) কুপগুলোকে সংস্কার করলে বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ঘাটতি মেটাতে বড়ো ভূমিকা রাখবে

“আমরা আশা করছি কৈলাশটিলা সাত নম্বর কূপ থেকে ১০ মের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে প্রায় দুই লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে,” বেনারকে বলেন সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) ও প্রকল্প পরিচালক আব্দুল জলিল প্রামাণিক।

তিনি বলেন, “দেশে ঘাটতি গ্যাসের সবটুকু এই আবিষ্কারের মাধ্যমে মেটানো যাবে না। তবে, কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস আমাদের ঘাটতি মেটাতে বড়ো ভূমিকা রাখবে।”

বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রের বেশ কিছু কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ (সাসেপেনডেড) রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এগুলোকে সংস্কার করে পুনরায় গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্যানুসারে, ২০০৯ সালে জানুয়ারি মাসে দেশে দৈনিক গ্যাসের উৎপাদন ছিল এক হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, দৈনিক গ্যাসের চাহিদা চার হাজার ঘনফুটের বেশি।

চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন ও বিদেশ থেকে আমদানিকৃত এলএনজিসহ গ্যাস সরবরাহ কমবেশি তিন হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে সাড়ে সাতশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।

কৈলাশটিলার এই কূপের ১৯ মিলিয়ন (এক কোটি ৯০ লাখ) ঘনফুট গ্যাস দিয়ে বাংলাদেশের “শতকরা ১৫ ভাগ আমদানি প্রতিস্থাপন করা যাবে,” বলে সোমবার বেনারকে জানান বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (গ্যাস) মোঃ মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী।

তিনি বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রতি ঘনফুট এলএনজি’র মূল্য কমবেশি ৩০ ডলার। অন্যদিকে বৈদেশিক কোম্পানির মাধ্যমে বাংলাদেশের উত্তোলিত গ্যাসের মূল্য প্রতি ঘনফুট প্রায় সাড়ে তিন ডলার।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বলে সিলেট গ্যাস ক্ষেত্রে উৎপাদিত প্রতি ঘনফুট গ্যাসের কোনো দাম ধরা হয় না বলে জানান তিনি।

তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রের সাসপেনডেড গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে অনেক গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব।

সারা দেশে গ্যাস সংকট

বিশ্বে অন্যতম গ্যাস সম্ভাবনাময় দেশ হওয়ার পরও বাংলাদেশে গ্যাস সংকট বিদ্যমান। চলমান রোজা ও ঈদের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট চলছে।

বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে সোমবার থেকে ঈদের দিনসহ তিনদিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঈদের রাত থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ অথবা গ্যাসের চাপ কম থাকবে বলে সোমবার তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বাংলাদেশে ১৯৫৫ সালে সিলেটে প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। এখন পর্যন্ত সারাদেশে ২৭টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এই সকল গ্যাসক্ষেত্রের মোট মজুদ ২৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।

১৯৬০ সালে দেশে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয় এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত ১৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হয়ে গেছে।

বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ব্যবহার বিবেচনায় নিলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গ্যাস মজুদ প্রায় শেষ হয়ে যাবে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই পরিপ্রেক্ষিতে কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হয়েছে যেখানে থেকে তরল আকারে আমদানি করা এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে বোতলে সরবরাহ করা হয়। একইভাবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরেও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে।

তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানি করে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের শতকরা ৪০ ভাগ বিদ্যুৎ গ্যাস থেকে উৎপাদিত হয় বলে বেনারকে জানান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা শাখার পরিচালক সৈয়দ গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলেন, “গ্যাস সংকটের কারণে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে এসেছে, বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে।”

সংকট মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন খাতে গ্যাস রেশনিং করছে, এমনকি ঈদের মধ্যেও বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকছে জানিয়ে তিনি বলেন, ঈদের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোদমে শুরু হলে গ্যাস সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে।

“তবে সিলেট গ্যাস ফিল্ড থেকে বাড়তি প্রায় দুই কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে আমাদের গ্যাস সঙ্কট কিছুটা হলেও কমবে,” যোগ করেন তিনি।

তাঁর মতে, বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি।

“বঙ্গোপসাগরে আমাদের সমুদ্রসীমায় গ্যাস উত্তোলনের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়,” বলেন গোলাম মোয়াজ্জেম।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান না হলে গ্যাসের দাম স্থিতিশীল হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, “সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে অতি উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করে টিকে থাকা সম্ভব নয়।”

“এ কারণেই আমাদের দেশের সাসপেন্ডেড গ্যাসক্ষেত্রগুলো সংস্কার করে সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা বাড়াতে হবে,” বলেন তিনি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন