বাঘের সংখ্যা বাড়াতে নতুন প্রকল্প: পুরুষ ও মাদি বাঘ কাছাকাছি আনার চেষ্টা

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.04.04
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
বাঘের সংখ্যা বাড়াতে নতুন প্রকল্প: পুরুষ ও মাদি বাঘ কাছাকাছি আনার চেষ্টা বাগেরহাট শরণখোলা এলাকায় সুন্দরবনে হাঁটছে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ১১ এপ্রিল ২০১৮।
[বাংলাদেশ বনবিভাগ/এএফপি]

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বা লোনাপানির বনাঞ্চল সুন্দরবনে অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সুন্দরবনের এক অংশ থেকে অন্য অংশে বাঘ স্থানান্তর করে পুরুষ-মাদি বাঘের মধ্যে সামঞ্জস্য এনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বাঘ রক্ষায় প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গত ২৩ মার্চ তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। বিষয়টি বেনারের কাছে নিশ্চিত করেছেন কমিশনের কর্মকর্তারা।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা দীপঙ্কর বর বেনারকে বলেন, “এই প্রকল্প অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য এই প্রথমবারের মতো বনের এক স্থান থেকে অন্য অঞ্চলে বাঘ স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।”

“জরিপে দেখা গেছে, সুন্দরবনের এক অঞ্চলে পুরুষ বাঘ বসবাস করে। আবার আরেকদিকে শুধু মাদী বাঘ বাস করে,” জানিয়ে তিনি বলেন, “এই অসামঞ্জস্য দুর করতে যেখানে শুধু মাদী বাঘ বাস করে, সেখানে অন্য অঞ্চল থেকে পুরুষ বাঘ নিয়ে যাওয়া হবে। ফলে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।”

দীপঙ্কর বর জানান, এই প্রকল্প ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন করে বাঘের সংখ্যা নির্ণয় করা হবে।

বঙ্গোপসাগর উপকূল ঘেঁষে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাটসহ বৃহত্তর বরিশাল জেলার কিছু অংশ নিয়ে সুন্দরবনের অবস্থান। এই বনের বাকি অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। তবে সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশ বাংলাদেশে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের অন্যতম ঐতিহ্য।

২০০৭ সালে সিডর, ২০০৯ সালে আইলা এবং ২০২১ সালে ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড় থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে রক্ষা করেছে সুন্দরবন।

তবে নির্বিচার অবৈধ বাঘ শিকারের কারণে সুন্দরবন থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিপন্ন হতে চলেছে।

সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। জরিপের বরাত দিয়ে জাতীয় সংসদকে সোমবার এ তথ্য জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে ২০১৫ সালে সর্বপ্রথম বাঘ গণনা করা হয়। ২০১৫ সালে সুন্দরবনের বাঘ গণনা করে ১০৬টি বাঘ পাওয়া যায় এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি।

বাঘ রক্ষায় বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৯-২০২৭) প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও সংসদকে জানান মন্ত্রী।

‘বাঘ না থাকলে সুন্দরবন থাকবে না’

সুন্দরবন বাংলাদেশের “বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ” উল্লেখ করে বাংলাদেশের বনাঞ্চল সংরক্ষণে নিয়োজিত বাংলাদেশ-আমেরিকা সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত আরণ্যক ফাউন্ডেশনের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “এই সুন্দরবনের ওপর লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য জড়িত। সুন্দরবনের কারণে আমাদের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চল বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পায়।”

তিনি বলেন, “বাঘ না থাকলে সুন্দরবন থাকবে না। তাই বন রক্ষার পাশাপাশি বাঘকে রক্ষা করতে হবে।”

অবৈধ বাঘ শিকার বন্ধ করতে বন বিভাগকে আরও তৎপর হতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। বনবিভাগের একার পক্ষে সুন্দরবন রক্ষা সম্ভব নয়। আমাদের দায়িত্ববান হতে হবে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম. এ. আজিজ ২০১৮ সালে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিয়ে জরিপে অংশ নিয়েছেন। তিনি শুক্রবার বেনারকে বলেন, “বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে বনবিভাগ যে প্রকল্প নিয়েছে সেটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে বাঘ রক্ষা করতে হবে।”

তিনি বলেন, “২০১৮ সালে আমরা যে জরিপ করেছিলাম তখন আমরা দেখলাম, সুন্দরবনের কিছু অঞ্চলে মাদি বাঘের সংখ্যা বেশি ছিল। আবার কিছু অংশে পুরুষ বাঘের সংখ্যা বেশি ছিল। বন বিভাগ বাঘ স্থানান্তর করার যে পরিকল্পনা করছে সেটি করা সম্ভব এবং উদ্যোগটি ভালো বলা যায়।”

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “শিবসা নদী সুন্দরবনকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। আমি দেখেছি শিবসা নদীর দুপারে বাঘের জেনেটিক ধরন দুই ধরনের। যদি শিবসা নদীর একপারের পুরুষ বাঘকে অন্য পারে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং জেনেটিক উন্নতি ঘটবে।”

অধ্যাপক আজিজ বলেন, এক স্থান থেকে অন্য অঞ্চলে বাঘ সরানোর সময় বাঘকে অচেতন করার পর গলায় ইলেকট্রনিক কলারব্যান্ড পরিয়ে দেয়া হয়। এর কারণ হলো এই কলারব্যান্ডের মাধ্যমে তার চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে হয় যাতে সে অন্য বাঘের অঞ্চলে গিয়ে আক্রান্ত না হয় এবং নতুন জায়গার তার নিজের এলাকা ঠিক করে নিতে পারে।”

তিনি বলেন, “তবে, বন বিভাগের উচিত ২০১৮ সালের জরিপের ওপর ভরসা না করে নতুন করে বাঘের অবস্থান দেখার পর যদি দেখা যায় পুরুষ-মাদি বাঘের সংখ্যার মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে তাহলে হস্তান্তর করা উচিত।”

সাধারণত একটি পুরুষ বাঘের বিপরীতে তিন থেকে চারটি মাদি বাঘ থাকা দরকার বলে জানান অধ্যাপক আজিজ।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন