অসময়ে পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাওরের একমাত্র ফসল

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.04.18
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
অসময়ে পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাওরের একমাত্র ফসল উজানের ঢলে ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামতের জন্য বস্তায় মাটি সংগ্রহ করছেন সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের বাঘমারা এলাকার কৃষকরা। ১৮ এপ্রিল ২০২২।
[ফোকাস বাংলা]

অসময়ের পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত জেলার একমাত্র ফসল বোরো ধানে হুমকির মুখে। বোরো ধান নষ্ট হলে হাওরাঞ্চলের এই সব জেলার লাখ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে পড়তে পারেন।

ভারতের চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টির কারণে গত কয়েকদিন প্রধান নদ-নদীতে ক্রমাগত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলায় কয়েকটি বাঁধ ভেঙে হাওরাঞ্চলের পাকা ধান ডুবে গেছে।

কিশোরগঞ্জ জেলায়ও বাঁধ ভাঙার আতঙ্কে রয়েছেন সেখানকার কৃষক পরিবার। পানি ক্রমাগত বাড়ছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, হাওরের বোরো ধান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড়ো ভূমিকা রাখে। তাঁদের মতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সারাবিশ্বে খাদ্যসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির পর হাওরের ফসলহানি বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে।

“সারাদেশে যে পরিমাণ জমিতে বোরো ধান চাষ হয় হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় তা শতকরা প্রায় নয় শতাংশ,” সোমবার বেনারকে বলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বেনজীর আলম।

এইসব এলাকায় বছরে একটি মাত্র ফসল হয়, আর তা বোরো ধান জানিয়ে তিনি বলেন, "এই ধান দিয়েই এখানকার মানুষ তাদের সারা বছরের খাদ্য চাহিদা মেটায়।”

হাওর এলাকার এই একমাত্র ফসলের ক্ষতি হলে সেখানকার হাজার হাজার দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলো অনাহারের মুখে পড়বেন বলে জানান তিনি।

গত কয়েকদিনের ঢলে সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলায় বাঁধ ভেঙে এ পর্যন্ত “সাত হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে,” জানিয়ে মহাপরিচালক বেনজীর বলেন, “আর সাত দিন পর যদি পানি বৃদ্ধি পেত তাহলে আমরা মোটামুটি সব ধান কাটতে পারতাম।”

২০১৭ সালে হাওরাঞ্চলে বোরো ফসলের ক্ষতি হওয়ার কারণে সরকারের পক্ষ থেকে সারা বছর সেখানকার মানুষগুলোকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হয় বলে জানান তিনি।

শঙ্কায় কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা

হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ধান কাটা চলে।

কিশোরগঞ্জ জেলার কৃষি বিভাগের উপপরিচালক সাইফুল আলম বেনারকে বলেন, জেলায় সোমবার রাত পর্যন্ত কোনো বাঁধ না ভাঙলেও মানুষ ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে।

তিনি বলেন, “ধনু নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, মিঠামইন ও অন্যান্য হাওরাঞ্চলে বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিনিয়তই পানি বাড়ছে বলে আমরা খবর পাচ্ছি। বাঁধ ভেঙ্গে গেলে সেখানকার পাকা ধানের সর্বনাশ হয়ে যাবে।”

একারণে তাঁরা কৃষকদের যাদের খেতের ধান শতকরা ৮০ ভাগ পেকে গেছে সেগুলো এখুনি কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

সাইফুল আলম জানান, কিশোরগঞ্জ জেলায় এ বছর এক লাখ ৬৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হাওরাঞ্চলেই হয়েছে এক লাখ তিন হাজার হেক্টর জমিতে। এই জেলা থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নেত্রকোণা জেলার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক এফ এম মোবারক আলী সোমবার বেনারকে বলেন, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে নেত্রকোণা জেলার মদন উপজেলার একটি পুরাতন বাঁধ ভেঙে গেছে।

ফসল রক্ষার জন্য চাষিদের ফসল কেটে নিতে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

গমের দাম বাড়িয়েছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে ২০২০-২১ অর্থবছরে সারাদেশে মোট তিন কোটি ৭৬ লাখ মেট্রিকটনের বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় তিন কোটি ৯৫ লাখ চাল উৎপাদিত হবে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ১৫ লাখের বেশি হিসাবে মোট বার্ষিক চাল-গমের চাহিদা দুই কোটি ৪২ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিকটন।

তবে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ফারাক থাকলেও ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশকে প্রতি বছর লাখ লাখ টন খাদ্য আমদানি করতে হয়।

মার্চ মাসে সংসদের অধিবেশনে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সংসদকে জানান, ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারিভাবে প্রায় পৌনে ছয় লাখ মেট্রিকটন চাল ও পৌনে পাঁচ লাখ মেট্রিকটন গম আমদানি করা হয়েছে।

এছাড়া, বেসরকারিভাবে একই সময়ে প্রায় সাত লাখ ৯০ মেট্রিকটন চাল এবং সাড়ে ৪৮ লাখ মেট্রিকটন গম আমদানি করা হয়েছে।

সরকারি হিসাবে, বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিকটন গম উৎপাদিত হয় এবং চাহিদা প্রায় ৮০ লাখ মেট্রিকটন। প্রতিবছরই বাংলাদেশে গমের উৎপাদন কমছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের হিসাবে, বাংলাদেশে গমের চাহিদা বাড়ছে এবং মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও শহরাঞ্চলে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে গমের চাহিদা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাবে।

সরকারি হিসাবে রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে বাংলাদেশ মোট গম আমদানির শতকরা ৪২ ভাগ মিটিয়ে থাকে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধের ফলে সেখান থেকে গম আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে।

এই সুযোগে অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশগুলো গমের দাম বৃদ্ধি করেছে। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আটা ও গম ভিত্তিক খাদ্যদ্রব্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক ওয়াইস কবির বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশ মূলত খাদ্য ঘাটতির দেশ। যদিও রাজনৈতিক কারণে বলা হয় আমরা খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশ। সেকারণেই প্রতিবছর ভারত, রাশিয়া, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হয়।”

তিনি বলেন, “আমাদের দেশে যত পরিমাণ ধান উৎপাদন হয় তার মধ্যে বোরো প্রায় শতকরা ৫৫ ভাগ। হাওরের বোরো ধান আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দরকার।”

ওয়াইস কবির বলেন, “তবে হাওরে ফসলহানির ফলে যে পরিমাণ ঘাটতি দেখা দেবে, সেটি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।