Follow us

বিমান ছিনতাই চেষ্টার অস্ত্রটি ছিল ‘খেলনা পিস্তল’

পুলক ঘটক
ঢাকা
2019-03-13
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশ বিমানের দুবাইগামী ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজটি ছিনতাই চেষ্টার কারণে চট্টগ্রামে জরুরি অবতরণের পর নিরাপত্তা রক্ষীদের অভিযান। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
বাংলাদেশ বিমানের দুবাইগামী ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজটি ছিনতাই চেষ্টার কারণে চট্টগ্রামে জরুরি অবতরণের পর নিরাপত্তা রক্ষীদের অভিযান। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
[এএফপি]

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডি জানিয়েছে, উড়োজাহাজ ছিনতাই চেষ্টার ঘটনায় ব্যবহার করা অস্ত্রটি ছিল প্রকৃতপক্ষে ‘খেলনা পিস্তল’। জব্দ করা অস্ত্রটির রাসায়নিক পরীক্ষা (ব্যালিস্টিক প্রতিবেদন) করে সিআইডি এই মত দিয়েছে।

বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা যুবক পলাশ আহমেদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হওয়ার পর অস্ত্রটি আসল না খেলনা ছিল—সেই বিতর্ক জোরদার হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের নানা বিবরণে এটিকে পিস্তল হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া বেনারকে জানান, “সিআইডি অস্ত্র পরীক্ষার প্রতিবেদনটি বুধবার সিএমপি’র কাছে হস্তান্তর করে, যেখানে এটিকে খেলনা পিস্তল বলা হয়েছে।”

রাজেশ বলেন, “ব্যালিস্টিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, খেলনা পিস্তল হওয়ায় সেটিতে বারুদ ব্যবহার বা গুলি করার কোনো সুযোগ ছিল না।”

তবে কীভাবে এই খেলনা পিস্তল নিয়ে ছিনতাই পরিকল্পনাকারী বিমানে উঠতে পারল, সে বিষয়ে তদন্তকারীদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার রুমানা আকতার বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, “খেলনা ওই পিস্তলের গায়ে ইংরেজিতে লেখা ছিল- “গান সিরিজ ওসাকা, আমান ইন্ডাস্ট্রিজ, মেইড ইন বাংলাদেশ।”

তিনি বলেন, “পিস্তলটির ম্যাগজিন আলাদা করা যায়। ভেতরে গুলির মতো করে ছোট ছোট প্লাস্টিকের দানা রাখা যায়। অল্প শব্দও হয়। তবে আসল পিস্তলের মতো দেখালেও পুরোটাই খেলনা।”

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ‘ময়ূরপঙ্খী’ নামক উড়োজাহাজটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।

চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইগামী উড়োজাহাজটি যাত্রী বেশে ওঠা পলাশ আহমেদ নামে এক যুবক ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছিল। সরকারিভাবে এই তথ্য জানানো হয়।

চট্টগ্রামে অবতরণের পর সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো ইউনিটের আট মিনিটের অভিযানে পলাশ নিহত হয়।

অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন

সিআইডি’র এই প্রতিবেদনের পরও পিস্তল না খেলনা পিস্তল—সেই সংশয় কাটছে না। ওই বিমানের যাত্রী ছিলেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মশিউর রহমান। তিনি সবচেয়ে কাছ থেকে ঘটনাটি দেখেছেন বলে দাবি করেন। ফেসবুকে দেওয়া তাঁর স্ট্যাটাস ২৮ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

ওই স্ট্যাটাসে মশিউর দাবি করেন, “ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী যুবক (পলাশ আহমেদ) শৌচাগারের দরজায় হ্যান্ডগান থেকে গুলি করেছিল। দ্বিতীয়বার যুবকটি ফাঁকা গুলি করে। যুবকটি দু’বার গুলি করেছে।”

ফেসবুকে লেখা সম্পর্কে জানতে চাইলে মশিউর রহমান ডেইলী স্টারকে বলেন, “আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না, ওই যুবকের হাতে খেলনা পিস্তল ছিল, না সত্যিকারের পিস্তল ছিল। তবে সেদিন ওই পরিস্থিতে আমাদের সবারই মনে হয়েছিল যে সেটা পিস্তল। তদন্তকারিরাই বলতে পারবে সেটি আসলে কী ছিল।”

ঘটনার দিন বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকা সাংসদ মাইনউদ্দিন খান বাদল পাইলটের বরাত দিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি বেনারকে বলেন, যুবকটির হাতে পিস্তল ছিল। জাতীয় সংসদেও একইদিন বাদল এই তথ্য উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমি ওই বিমানে ছিলাম না। তবে ঘটনার সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলাম। পাইলট আমাকে ঘটনাটি বিস্তারিত জানান।”

ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অভিযান পরিচালনাকারী যৌথ বাহিনীর সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, “যুবকটির কাছে একটি পিস্তল ছিল। তাকে প্রথমে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছিল। আত্মসমর্পণ না করে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠায় এক পর্যায়ে গোলাগুলিতে সে আহত হয়। এরপর মারা যায়।”

তবে পরবর্তী সময়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ছিনতাইকারীর কাছে যে পিস্তলটি পাওয়া গেছে তা খেলনা পিস্তল।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) আব্দুর রশিদ বেনারকে বলেছেন, “ব্যবহৃত পিস্তলের ছবি দেখে এটিকে খেলনা পিস্তল বলে মনে হয়েছে।”

তিনি বলেন, “খেলনা পিস্তল না হলে গুলির কারণে বিমানে ছিদ্র তৈরি হত। তাতে বাতাসের চাপে বিমান বিস্ফোরিত হওয়ার ভয় ছিল। তা ছাড়া, বিমান ছিনতাইকারির গুলিতে যাত্রী কিংবা অভিযান পরিচালনাকারী কেউ আহত হয়নি।”

তদন্ত প্রতিবেদন

সিআইডি ব্যালিস্টিক প্রতিবেদন দেওয়ার দিনই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিও তাদের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।

“প্রতিবেদনে কী আছে তা আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের জানানো হবে,” বেনারকে বলেন বেসামরিক বিমান পরবিহন ও পর্যটন সচিব মহিবুল হক।

নিষিদ্ধ হল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স

বাংলাদেশের আকাশে বিশ্বের সর্বাধুনিক উড়োজাহাজ হিসেবে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সাময়িকভাবে আটকে গেছে। বিভিন্ন দেশের ধারাবাহিকতায় বুধবার বাংলাদেশও এই মডেলের বিমানের উপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

“এই মডেলের কোনো বিমান বাংলাদেশে ওঠানামা করতে পারবে না,” বেনারকে বলেছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পরিচালক (উড্ডয়ন নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ) উইং কমান্ডার চৌধুরী এম জিয়াউল কবির।

তিনি বলেছেন, “লায়ন এয়ার ও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের দুটি নতুন বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স-৮ দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা থাকবে।”

“তবে বাংলাদেশের আকাশ সীমা দিয়ে এই উড়োজাহাজের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়নি। শুধুমাত্র বাংলাদেশের কোনো বিমানবন্দরে এই উড়োজাহাজ উঠানামা থাকবে না,” বলেছেন জিয়াউল কবির।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে দেশে প্রথমবারের মত বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ আনার ঘোষণা দেয়।

সিভিল অ্যাভিয়েশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা এ কে এম রেজাউল করিম বেনারকে বলেন, “আগে কিছু চলাচল করলেও বর্তমানে কোনো বিদেশি এয়ারলাইনসও বাংলাদেশে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ব্যবহার করছে না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন