রাঙ্গামাটিতে সরকারি কার্যালয়ে ঢুকে ইউপি সদস্যকে গুলি করে হত্যা

শরীফ খিয়াম
2021.02.24
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
রাঙ্গামাটিতে সরকারি কার্যালয়ে ঢুকে ইউপি সদস্যকে গুলি করে হত্যা বাজার নিয়ে নৌকায় করে বাড়ি ফিরছেন কাপ্তাই হ্রদ বেষ্টিত রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকার কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। ২১ এপ্রিল ২০১৬।
[শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আঞ্চলিক দলগুলোর সংঘাতের ধারাবাহিকতায় বুধবার উপজেলা পরিষদে বৈঠকের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন এক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। 

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ে বুধবার দুপুর একটার দিকে বৈঠক করছিলেন রূপকারি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সমর বিজয় চাকমা (৩৮)। ওই সময় আকস্মিকভাবে একজন পিআইওর কক্ষে ঢুকে সমরকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে বলে বেনারকে জানান বাঘাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন খান। 

ওসি জানান, পিআইওর সঙ্গে সমরের বৈঠকের সময় কক্ষের বাইরে দুই-তিনজন লোক ঘোরাঘুরি করছিল। তাদেরই একজন ওই কক্ষে ঢুকে সমরের বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। 

সমরের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে ওসি বলেন, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। 

নিহত সমর ছিলেন পাহাড়িদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী অংশের (এমএন লারমা গ্রুপের) যুব সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও উপজেলা শাখার ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক।

সরকারের সঙ্গে সন্তু লারমার ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে পরের বছর জেএসএস ভেঙে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।

এরপর ২০১০ সালে জেএসএস আরেক দফা ভেঙে গঠিত হয় ‘জেএসএস (এমএন লারমা)’ দল। এই দলটি স্থানীয়ভাবে জেএসএস এর সংস্কারপন্থী অংশ হিসেবে পরিচিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই উপদলগুলোর সংঘাতে প্রাণহানি প্রায় নিয়মিত ঘটনা। 

“পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জেএসএস-এর মূল দল বা সন্তু লারমা গ্রুপ এবং সংস্কারপন্থী বা এমএন লারমা গ্রুপের দ্বন্দ্বের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে,” বলেন ওসি আনোয়ার হোসেন।

বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ ভবনে পিআইওর কক্ষের অদূরেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরিফুল ইসলামের কার্যালয়।

ঘটনার সময় নিজ কক্ষেই ছিলেন জানিয়ে তিনি বেনারকে বলেন, “অফিস চলাকালে একজন কর্মকর্তার কক্ষে ঢুকে এভাবে সরাসরি গুলি চালিয়ে এক জনপ্রতিনিধিকে হত্যা করা কল্পনাতীত বিষয়। নিকট অতীতে এমন ঘটনা ঘটেনি।” 

“সাধারণত আমরা প্রায়ই এখানে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা দেখি। এলাকার সাধারণ মানুষও এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কিন্তু এভাবে সরকারি অফিসে ঢুকে প্রতিপক্ষকে হত্যার ঘটনা খুবই দুঃখজনক।”

“আমরা যারা এখানে জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি, এই ঘটনার পর তারা সবাই আতঙ্কিত,” যোগ করেন ইউএনও। 

এই ঘটনার পর উপজেলা পরিষদ এলাকায় স্থায়ীভাবে পুলিশ পাহারার অনুরোধ জানানো হয়েছে জানিয়ে ইউএনও বলেন, পরিষদে শিগগিরই সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর কথাও ভাবছেন তাঁরা। 

এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিজিবি-পুলিশের যৌথ টহল অব্যাহত রয়েছে এবং সার্বিক নিরাপত্তা আরো জোরদার করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান ওসি। 

অভিযোগ প্রতিপক্ষের দিকে

জেএসএস সন্তু লারমা দলের সন্ত্রাসীরাই সমরকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন জেএসএস-এর সংস্কারপন্থী অংশ। 

এই দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা বেনারকে বলেন, “জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপের সন্ত্রাসীরাই তাঁকে (সমরকে) হত্যা করেছে। চার-পাঁচ মাস আগে সমরের বড়ো ভাইকেও একইভাবে হত্যা করেছিল তারা।”

এ নিয়ে গত এক বছরে সংগঠনটির ১২ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। 

জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপের বাঘাইছড়ি উপজেলার শাখার সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিপ চাকমার কাছে মুঠোফোনে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রতিপক্ষের অভিযোগের বিষয়ে কোনো জবাব না দিয়ে তিনি বেনার প্রতিনিধির কল কেটে দেন।

তবে স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি জানান, তাঁর সংগঠন কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত নেই। তাঁরা পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছেন। 

নিহত সমরের পরিবারে স্ত্রী, দুটি শিশু সন্তান, বৃদ্ধা মা এবং আরো এক ভাই রয়েছেন বলেও জানিয়েছেন সুদর্শন। 

‘দলগুলো ঐক্যমত্যে না পৌঁছালে সংঘাত থামবে না’

সমর হত্যার ঘটনাটিকে “জঘন্য ও ঘৃণিত” আখ্যা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত-সংঘর্ষ চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকার বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।”

“শান্তি চুক্তির আগে সংঘাতটা ছিল সেনাবাহিনীর সাথে সেখানকার শান্তিবাহিনীর। কিন্তু পাহাড়িরা এখন নিজেদের মধ্যে প্রাধান্য বিস্তারের খেলায় মত্ত। এরই জেরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড দেখছি আমরা। সেখানকার আঞ্চলিক দলগুলোকে নেতৃত্ব দেওয়া অভিজাতরা ঐক্যমত্যে না পৌঁছালে এটা থামবে না,” যোগ করেন এই গবেষক। 

পাহাড়িদের অধিকার আদায়ে ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জেএসএস ১৯৭৫ সালে তাঁদের সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী গঠন করে বাংলাদেশ এবং পাহাড়ে বসতি স্থাপনকারী বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছিল।

“জেএসএস-এর মূলধারার প্রধান নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করলেও পাহাড়িদের একটি অংশ শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে,” বলেন ড. রফিকুল।

এই বিরোধিতার ধারাবাহিকতায় ইউপিডিএফ ও সংস্কারপন্থী অংশের আত্মপ্রকাশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “২৩ বছরেও শান্তি চুক্তির সব শর্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায়, পার্বত্য এলাকায় বাঙালি-পাহাড়ির সংখ্যা প্রায় সমান হয়ে যাওয়াসহ নানা জটিল সমীকরণে পরিস্থিতি ক্রমশ ঘোলাটে হচ্ছে।”

তাঁর মতে, “পাহাড়িরা নিজেদেরকে বঞ্চিত মনে করছে বলেই সংঘাতে জড়াচ্ছে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।