Follow us

আল-কায়েদা ঘনিষ্ঠ হুজি-বি নেতা আতিকুল্লাহসহ তিন জঙ্গি গ্রেফতার

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-10-03
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী, বাংলাদেশ (হুজিবি)-এর শীর্ষ জঙ্গি আতিকুল্লাহ ওরফে আসাদুল্লাহ ওরফে জুলফিকার। অক্টোবর ০২, ২০১৯।
হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী, বাংলাদেশ (হুজিবি)-এর শীর্ষ জঙ্গি আতিকুল্লাহ ওরফে আসাদুল্লাহ ওরফে জুলফিকার। অক্টোবর ০২, ২০১৯।
নিউজরুম ফটো।

জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মোহাম্মদ আতিকুল্লাহ ওরফে আসাদুল্লাহ ওরফে জুলফিকারকে (৪৯) নামক এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছ ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম সিটিটিসি। পুলিশের দাবী, গ্রেপ্তারকৃত জুলফিকার আল-কায়েদা ও তালেবানসহ বিভিন্ন দেশের উগ্রপন্থী মৌলবাদী ইসলামি সংগঠনগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠ একজন।

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার নিকুঞ্জ-২ বড় মসজিদ সংলগ্ন মাঠ থেকে দুই সহযোগীসহ আটক হওয়া এই জঙ্গি হরকাতুল-উল-জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) শীর্ষ নেতা। আতিকুল্লাহ ‘আফগান ফেরত যোদ্ধা’ এবং  ‘বোমা বিশেষজ্ঞ’ বলেও দাবি করেছে পুলিশ।

ডিএমপির অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান বৃহস্পতিবার দুপুরে বেনারকে বলেন, “তাঁর সাথে আল-কায়েদার প্রয়াত প্রধান ওসামা বিন লাদেন, তালেবানদের সাবেক শীর্ষ নেতা মোল্লা ওমর এবং আল-কায়েদার বর্তমান নেতা আইমান আল জাওয়াহেরির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।”

আতিকুল্লাহর সাথে গ্রেপ্তার হওয়া অপর দুই জঙ্গি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন ওরফে শামীম (৪৩) ও মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন রাব্বানী (৪২) হুজিবির ঢাকা মহানগর এবং ফেনী জেলার নেতা। তিনজনের বিরুদ্ধেই খিলক্ষেত থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমাণ্ড চাওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সিটিটিসির এডিসি তৌহিদুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “আতিকুল্লাহ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুবাই হয়ে সৌদি আরব গিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। পলাতক থাকাকালীন একাধিকবার পাকিস্তানে গিয়ে জঙ্গিনেতাদের সাথে বৈঠকের কথাও তিনি স্বীকার করেছেন।”

“পাকিস্তান ছাড়াও দুবাই, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের জঙ্গিদের সাথে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে,” বলেন কাউন্টার টেররিজম বিভাগের এই কর্মকর্তা।

আদালত তাদের প্রত্যেককে চারদিন করে রিমান্ড নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।

হুজি-বির পুনর্জাগরণ চেষ্টা

হরকাতুল-উল-জিহাদ আল-ইসলামীর (হুজি) বাংলাদেশ শাখা ‘হুজি-বি’ কাশ্মীর ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে পুঁজি করে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের দাবি, পাকিস্তানি জঙ্গিদের পরামর্শে হুজি-বি আবার সচল করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গত মার্চে দেশে ফেরেন আতিকুল্লাহ।

“দেশে ফিরেই সংগঠনের পুরোনো সদস্যদের সক্রিয় করার পাশাপাশি নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে সাংগঠনিক সফরসহ ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেন তিনি। কারাবন্দী জঙ্গিদের মুক্ত করতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস হতে অর্থ সংগ্রহের কথাও তিনি স্বীকার করেছেন,” বেনারকে বলেন এডিসি তৌহিদুল।

ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইসিএলডিএস) নির্বাহী পরিচালক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বেনারকে বলেন, “যে দুটি সমস্যাকে সামনে রেখে হুজি-বি পুনরুজ্জীবিত হতে চাচ্ছে, সেগুলো মূলত ভূ-রাজনৈতিক। যে কারণে এটা সহজেই বোধগম্য যে, এই জঙ্গি সংগঠনের পুনর্জাগরণ চেষ্টার পেছনে বিদেশি অর্থায়ন রয়েছে।”

“কাশ্মীর ইস্যুতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে পাকিস্তান আগ্রহী হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা ছাড়া শুরু থেকেই বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন রোহিঙ্গা শিবিরে তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করেছে। এমন আগ্রহ ও চেষ্টার মিশেলে জঙ্গি পৃষ্ঠপোষকতাও ফের বাড়ছে,” যোগ করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

অন্যদিকে হুজি-বি নেতা আতিকুল্লাহও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বিস্তারের চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শুরু থেকেই রোহিঙ্গা বিদ্রোহকে সমর্থন দেওয়া এই জঙ্গিগোষ্ঠীর সাথে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা জাতীয় সংস্থার (এআরএনও) সম্পর্ক থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা।

মেজর জেনারেল (অব.) রশিদ বলেন, “জাতিসংঘের সর্বশেষ অধিবেশনেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের নয়, আঞ্চলিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।”

প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনাকে একাধিকবার হত্যাচেষ্টার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বোমা ও গ্রেনেড হামলা শতাধিক মানুষের প্রাণ নেওয়া এই উগ্রবাদী সংগঠনটিকে ২০০৫ সালে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

কে এই জঙ্গি আতিকুল্লাহ?

১৯৯২ সালে সংবাদ সম্মেলন করে আত্মপ্রকাশ করে আফগান ফেরত জঙ্গিদের প্লাটফর্ম হরকাতুল জিহাদ, বাংলাদেশ । ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, ২০০১ সালে রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলাসহ বাংলাদেশে সংঘটিত কমপক্ষে আটটি বড় জঙ্গি হামলায় তাদের সম্পৃক্ততা ছিল। ২০১৭ সালে হুজি-বির প্রধান মুফতি হান্নানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এরপর দলটির তৎপরতা একরকম ছিল না বললেই চলে।  নতুন করে আবারও সংগঠনটি এখন আলোচনায় আসছে।

একাধিক অপরাধের জন্য ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জঙ্গিনেতা মুফতি আব্দুল হান্নানের নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে হুজি-বির যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, তাতে সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন আতিকুল্লাহ। পরবর্তীতে তিনি সংগঠনের বায়তুল মাল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।

সিটিটিসি জানায়, ফেনী জেলার দাগনভুঁইয়া দেবরামপুরের হাফেজ আহসান উল্লাহর সন্তান তিনি। আশির দশকের শেষের দিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেয়। তখন থেকেই ওসামা বিন লাদেন, মোল্লা ওমর এবং জাওয়াহেরির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর।

উল্লেখ্য, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের বাংলাদেশী মুজাহিদীনদের দ্বারা ১৯৮৯ সালে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যশোরের মনিরামপুরের মাওলানা আবদুর রহমান ফারুকী। ওই বছরই আফগানিস্তানে মাইন অপসারণের সময় তিনি নিহত হন।

হামলার শঙ্কা নেই: ডিএমপি

এদিকে বৃহস্পতিবার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শনে গিয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “পূজায় কোনো সহিংসতার আশঙ্কা নেই। তারপরও কোথাও হামলা হলে সেটি মোকাবিলার জন্য আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে।”

তিনি বলেন, “আপনারা জানেন ঢাকা মহানগরীর ভেতরে পরপর পাঁচটি বোমা হামলা হয়েছিল, যেগুলো ছিল পুলিশের ওপর জঙ্গিদের হামলা। সেই জঙ্গিদের পুরো দলটাকে আমরা ধরতে পেরেছি। ওইদিক থেকে জঙ্গি হামলার যে আশঙ্কা ছিল আমরা মনে করি সেটি এখন আর নেই।

অন্যান্য সন্দেহভাজনরাও পুলিশের  নজরদারির ভেতরে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ডিএমপি প্রধান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন