করোনাভাইরাস নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ, মুফতি ইব্রাহিম গ্রেপ্তার

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2021-09-28
Share
করোনাভাইরাস নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ, মুফতি ইব্রাহিম গ্রেপ্তার আটকের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের হেফাজতে ইসলামি বক্তা মুফতি কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১।
[বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাস এবং এর প্রতিষেধকের বিষয়ে মিথ্যা তথ্য ও অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে আলোচনায় আসা ইসলামি বক্তা মুফতি কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে (৫৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। 

“ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে,” সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ইব্রাহিমকে তাঁর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয় বলে বেনারকে জানান ডিএমপি’র গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ফারুক হোসেন।

তিনি জানান, ২০ ঘণ্টার বেশি সময় জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়ায় “তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে।” 

এদিকে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার অভিযোগে জেড এম রানা নামের এক ব্যক্তি মুফতি ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন বলে মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে বারোটার দিকে বেনারকে জানান থানার ডিউটি অফিসার সাহেদুল ইসলাম।

তবে রানার পরিচয় জানাতে পারেননি পুলিশের এই উপ-পরিদর্শক। 

ইব্রাহিম দীর্ঘদিন ধরে “ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে করোনা নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করছেন,” মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ও গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম-কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ। 

তিনি বলেন, “তিনি (ইব্রাহিম) নাকি করোনা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন, কীভাবে করোনা আসবে সেটাও জানতেন। তা ছাড়া করোনার ভ্যাকসিন নিলে ছেলেরা মেয়ে এবং মেয়েরা ছেলে হয়ে যাবে—এমন কথাও তিনি বলেছেন।”

“মুফতি ইব্রাহিম প্রায়ই বাংলাদেশে ভারতের দালাল বা সে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং)-এর গুপ্তচরদের উপস্থিতির কথা বলেন। এসব ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য ও তথ্য প্রচার করে তিনি জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন,” উল্লেখ করে হারুন-অর-রশীদ বলেন, সেগুলো খতিয়ে দেখার জন্যই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল। 

তবে জিজ্ঞাসাবাদে মুফতি ইব্রাহিম তাঁর বক্তব্যের স্বপক্ষে “সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি,” বলে সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে জানান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান এ কে এম হাফিজ। 

এর পরেই তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি নেয় পুলিশ। বুধবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। 

ibrahim2.jpeg
আটকের পর তাঁর মুক্তির দাবিতে ফেসবুকে মুফতি ইব্রাহিমের অনুসারীদের প্রচারণা। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। [শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

‘আরো আগেই ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল’

করোনা বিষয়ক অবৈজ্ঞানিক প্রচারণা থেকে নিবৃত করতে মুফতি ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে আরো আগেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী।

“মহামারিতে গুজব খুবই বাজে প্রভাব ফেলে। যে কারণে এটা আটকানো এবং সত্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করাটা সবচেয়ে জরুরি ছিল,” বেনারকে বলেন ডা. এহতেশাম।

“শুরু থেকেই তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। বিশেষ করে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ক ভুয়া প্রচারণার কারণে অনেক ক্ষতি হয়েছে,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সারা দেশে হাজার হাজার মানুষ মারা যাওয়ার পর সবাই বুঝতে পেরেছে টিকা ছাড়া কোনো পথ নেই।” 

মুফতি ইব্রাহিমের ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসায় আটকের অভিযান চলাকালে তিনি ফেসবুক লাইভে এসে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। ভারত বিরোধী বক্তব্য দেওয়ার কারণে তাঁকে গুম করা হতে পারে বলেও ২০ মিনিটের ওই লাইভে উল্লেখ করেন ইসলামি এই বক্তা। 

মুফতি ইব্রাহিমের লাইভ ভিডিওটির কথা উল্লেখ করে আরেক আলোচিত ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী ফেসবুকে লিখেছেন, “মুফতি কাজী ইব্রাহীম এই দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় প্রবীণ আলেম। আজ ভিডিও বার্তায় তাঁর যে অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে— তা ব্যথিত করেছে গোটা দেশের সকল ইসলামপ্রিয় জনতাকে।”

“এমন নির্বিবাদী উম্মাহ দরদী আলেমের সাথে এরকম আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই,” উল্লেখ করেন তিনি। 

বিভিন্ন সময়ে ফেসবুক ও ইউটিউবে তাঁর ওয়াজের বক্তব্য ‘ভাইরাল’ হওয়ার সুবাদে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন মুফতি ইব্রাহিম। গত বছর স্বপ্নে করোনাভাইরাসে টিকা আবিষ্কারের সূত্র পাওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন এই মুফতি।

এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান ওয়াজ-মাহফিল ও ধর্মীয় বক্তৃতায় কাল্পনিক গল্প ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য নিষিদ্ধ করে পবিত্র কোরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের ‘রেফারেন্স’ উল্লেখ বাধ্যতামূলক করার জন্য ব্যবস্থা নিতে তিন মন্ত্রণালয়ের (ধর্ম, স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা) সচিব ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালককে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন।

তার আগে ২০১৯ সালের মার্চে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা ওয়াজের নামে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্ম বিদ্বেষ, নারী বিদ্বেষ, গণতন্ত্রবিরোধী, দেশীয় সংস্কৃতিবিরোধী ও জঙ্গিবাদের পক্ষে বক্তব্য দেওয়া ১৫ জন ইসলামি বক্তার একটি তালিকা তৈরি করেছিল। 

ওই তালিকায় থাকা মুফতি মাহমুদুল হাসান গুনবী, মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন, মুফতি আমির হামজাসহ হেফাজতে ইসলামপন্থী বেশ কয়েকজন বক্তাকে চলতি বছর আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

সর্বশেষ মুফতি ইব্রাহিম আটক হওয়ার আগে ১৭ সেপ্টেম্বর মুফতি রিজওয়ান রফিকীকে ঢাকার বাসাবো এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। 

মুফতি ইব্রাহিমের পাঁচ ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে, তাঁদের মধ্যে দুইজন দেশের বাইরে (মিশরে ও সৌদি আরবে) রয়েছেন বলে বেনারকে জানান নরসিংদীর জামেয়া কাসেমিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ শায়খ দেলোয়ার হোসাইন আল মাদানী।

মুফতি ইব্রাহিমকে ‘মুহাদ্দিস’ (হাদিসের পণ্ডিত) আখ্যা দিয়ে তাঁকে আটকের এই ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে উল্লেখ করে মাদানী জানান, ইব্রাহিম ৩৪ বছর ধরে ওই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। 

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মুফতি ইব্রাহিমকে আইনি সহায়তা দেবে কিনা, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে জানিয়ে মাদানী বলেন, আটক হওয়ার পর ইব্রাহিমের পরিবারের সদস্যদের সাথে তাঁরা যোগাযোগ রেখে চলেছেন, “তাদের ভালোমন্দ দেখভাল করা হচ্ছে।” 

প্রসঙ্গত, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ত্রি-ভাষিক ‘পিস স্কুলের’ ১৪টি শাখা প্রতিষ্ঠার নেপথ্যেও ছিলেন মুফতি ইব্রাহিম, জঙ্গিবাদে উৎসাহ ও প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগে ২০১৬ সালে সেগুলো বন্ধ করে দেয় সরকার।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন