সাবেক মেজর সিনহা হত্যায় ওসি প্রদীপসহ দুই পুলিশের মৃত্যুদণ্ড

সুনীল বড়ুয়া ও শরীফ খিয়াম
2022.01.31
কক্সবাজার ও ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
সাবেক মেজর সিনহা হত্যায় ওসি প্রদীপসহ দুই পুলিশের মৃত্যুদণ্ড রায়ের পর আদালত থেকে বের করে আনা হচ্ছে অভিযুক্ত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে। ৩১ জানুয়ারি ২০২২।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার রায়ে টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ এবং বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক (আইসি) লিয়াকত আলীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত।

কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল সোমবার দুপুরে আলোচিত এই রায় পড়ার সময় এজলাসে উপস্থিত বহিষ্কৃত এই দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

“তাঁদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই রায় দিয়েছে,” বেনারকে বলেন বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর।

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফে) সাবেক সদস্য সিনহাকে হত্যায় সহযোগিতা এবং প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় জড়িত থাকায় পুলিশের আরো তিন সদস্য এবং তাঁদের তিন তথ্যদাতাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারক।

টেকনাফ থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত এবং সিপাহী রুবেল শর্মা ও সাগর দেব এবং কক্সবাজারের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিনকে এই সাজা দেওয়া হয়েছে।

মামলার ১৫ আসামির মধ্যে জেলা পুলিশের চার এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্যকে বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত।

কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুরে এপিবিএনের তল্লাশিচৌকিতে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে সিনহাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ৫ আগস্ট আদালতে এই হত্যা মামলা দায়ের করেন তাঁর বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস।

একইদিন ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সিনহা হত্যা মামলার বিচার দাবি জানায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের সংগঠন রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)।

চারমাস পর ১৩ ডিসেম্বর প্রদীপ-লিয়াকতসহ ১৫ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম। প্রদীপের পরিকল্পনাতেই লিয়াকত গুলি করে সিনহাকে হত্যা করেন বলে আদালতকে জানান এই তদন্তকারী কর্মকর্তা।

গত বছরের ২৭ জুন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই মামলার বিচার শুরু হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখিত ৮৩ সাক্ষীর মধ্যে ৬৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ১২ জানুয়ারি আদালত রায় ঘোষণার দিন ধার্য করে।

বাদী-বিবাদী-রাষ্ট্রপক্ষের অসন্তোষ

রায়ের পর বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, “প্রত্যাশা ছিল প্রধান দুই আসামির যেন সর্বোচ্চ সাজা হয়, সেটা পূরণ হয়েছে। তবে সন্তুষ্ট সেদিনেই হবো, যেদিন রায়টি কার্যকর হবে।”

তাছাড়া রায়ে যে সাতজনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে তাঁরাও পুরোপুরি নিরপরাধ বলে মনে করেন না তিনি। “তাঁদেরও কিছু সাজা হলে প্রত্যাশা আরেকটু বেশি পূরণ হয়েছে বলা যেত,” উল্লেখ করে শারমিন জানান, তাঁরা এ ব্যাপারে আপিল করার কথা ভাবছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল আলমও সাত আসামির খালাসে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। “যে সাতজনকে খালাস দেয়া হয়েছে তাঁদের বেশিরভাগই যাবজ্জীবন হওয়া আসামিদের সমান অপরাধ করেছে,” বলেন তিনি।

তবুও মামলার তদন্ত সংস্থা এবং আইনজীবীদের প্রতি পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে শারমিন বলেন, “সবাই আন্তরিকভাবে কাজ করলে যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, সেই দৃষ্টান্ত তাঁরা স্থাপন করেছেন। এতে মানুষ আশাবাদী হবে।”

অন্যদিকে রায়ে সংক্ষুব্ধ হওয়ার কথা জানিয়ে আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী মহিউদ্দিন খান বলেন, “আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমরা খুব দ্রুত আপিলের আবেদন করব।”

“আদালতে সাক্ষীরা হত্যা পরিকল্পনার বিষয়টি প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। তারা অনেক মনগড়া কথা বলেছে,” যোগ করেন তিনি।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত রুবেলের ভাই রাহুল শর্মা আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, “সিনহা হত্যা মামলার সব আসামিকে ঢালাওভাবে দোষী বানিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে। অথচ সকল আসামিই দোষী না। মূলত ওসি প্রদীপের কারণে তাঁদেরকে ফাঁসানো হয়েছে।”

হত্যার নেপথ্যে ক্রসফায়ার বাণিজ্য

আদালতের নথির বরাত দিয়ে বাদীর আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বেনারকে বলেন, “কক্সবাজারে ভ্রমণ বিষয়ক তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে টেকনাফ পুলিশের ক্রসফায়ার বাণিজ্যের অভিযোগ পেয়েছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ নিয়ে অনুসন্ধানের কারণেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়।”

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর টেকনাফ থানায় যোগ দেওয়া প্রদীপকে ‘ক্রসফায়ারে দিয়ে এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে’ টাকা আদায়ের নির্মম নেশায় পেয়ে বসেছিল।

সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের তৎকালীন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের প্রতিবেদনেও বলা হয়, টেকনাফ থানায় ওসি প্রদীপের ৩৩ মাসের সময়কালে ১০৬টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১৭৪ ব্যক্তি নিহত হন।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের শিক্ষার্থী সাহেদুল ইসলাম সিফাত, শিপ্রা দেবনাথ ও তাহসিন রিফাত নূরকে সাথে নিয়ে কক্সবাজারে ২০২০ সালে ৩ জুলাই থেকে সেখানে তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজ করছিলেন সিনহা।

তখনই তিনি প্রদীপের অত্যাচার-নিপীড়নের কথা জানতে পারেন এবং তাঁর সঙ্গে অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন। হুমকি দিয়ে সিনহা ও তাঁর দলকে থামাতে না পেরে প্রথমে তাঁদের ডাকাত সাজিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন প্রদীপের তিন সোর্স।

তাঁরা ব্যর্থ হওয়ায় সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা মাথায় সিনহাকে গুলি করে হত্যা করেন লিয়াকত। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, ওসি প্রদীপ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, সিনহার দলটিকে সুবিধামতো পেলে জানে শেষ করে দিতে হবে।

“হত্যার ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মেজর (অব.) সিনহা ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে পর পর তিনটি সাজানো ও বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়,” বলেও উল্লেখ রয়েছে অভিযোগপত্রে।

রায়ের আগে টেকনাফের সর্বস্তরের জনসাধারণের ব্যানারে প্রদীপের ফাঁসির দাবিতে আদালত চত্বরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বেনারকে বলেছেন, প্রদীপ অনেক নিরীহ মানুষকেও ‘ক্রসফায়ার’ দিয়েছেন।

তবু থামবে না বিচারবহির্ভূত হত্যা

বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “এমন দুই-একটি রায়ের মধ্য দিয়ে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে বলে বিশ্বাস করি না।”

“এটি বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বার্তা দিতে হবে। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাঁদের এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। শুধু তাঁদের নির্দেশনার মধ্য দিয়েই এই ধরনের ঘটনা কমে আসতে পারে বা বন্ধ হতে পারে,” যোগ করেন এই মানবাধিকার কর্মী।

আসকের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মোট ২২২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে জুলাই পর্যন্ত মারা গেছেন ২১০ জন। অর্থাৎ ওই বছর সিনহার মৃত্যুর পর মাত্র ১২টি এমন ঘটনা ঘটেছে।

এছাড়া সিনহা হত্যার আগের বছরে (২০১৯ এভাবে মারা গেছেন ৩৮৮ জন এবং পরের বছরে (২০২১) সালে এমন ৮০টি ঘটনা ঘটেছে।

“সিনহা হত্যার আগে-পরে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা অনেক ওঠা-নামা করলেও এখনই এটা বলার সুযোগ নেই যে এটা পুরোপুরি থেমে গেছে,” দাবি নূর খানের।

গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাব এবং এর সাবেক ডিজি ও বর্তমান পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদসহ সাতজন কর্মকর্তার নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এমন একটি ঘটনাও ঘটেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তবুও আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম।”

“বিগত দিনে আমরা দেখেছি, বিশেষ বিশেষ সময়ে যখন মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় বা কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন আসে, তখন ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধের মতো ঘটনাগুলোয় বিরতি টানা হয়। আবার কিছুদিন পরে পূর্ববৎ অবস্থা ফিরে আসে,” বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর কক্সবাজার পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা-প্রতিক্রিয়া শুরু হলে সেপ্টেম্বরে চার দফায় কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের এক হাজার ৪১৩ পুলিশ সদস্যকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।