মালয়েশিয়া সরকারের সমালোচনার মুখে বাংলাদেশ দূতাবাসের ‘চাকরির খোঁজ’ পোর্টাল

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2021-04-15
Share
মালয়েশিয়া সরকারের সমালোচনার মুখে বাংলাদেশ দূতাবাসের ‘চাকরির খোঁজ’ পোর্টাল কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসে খাদ্য সহায়তার আওতায় খাবার খাচ্ছেন কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক। ২৫ ডিসেম্বর ২০০৭।
[এএফপি]

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুবিধার্থে একটি অনলাইন চাকরির পোর্টাল চালু করা নিয়ে মালয়েশিয়ার সরকার ও সেখানকার বাংলাদেশ হাই কমিশনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। 

বাংলাদেশ হাই কমিশনের সমালোচনা করে মালয়েশিয়ার সরকার বলছে, এই পোর্টাল চালুর বিষয়ে তাঁরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে পরামর্শ করেনি। তবে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস বলছে, পোর্টালটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশটির সরকারের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। 

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে মালয়েশিয়ার মানব সম্পদমন্ত্রী এম সারাভানান বলেন, এই পোর্টালটি মালয়েশিয়ার চারশোরও বেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে হুমকির সম্মুখীন করবে, যারা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসায় না থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ফি দিয়ে আসছে। পাশাপাশি এর ফলে মালয়েশিয়ায় অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বাড়বে। 

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বেনারকে পাঠানো এক বিবৃতিতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার মো. গোলাম সরোয়ার বলেন, “এই চাকরির পোর্টালটি মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত আনডকুমেন্টেড (অনিবন্ধিত) বাংলাদেশিদের বৈধকরণে সহায়তা করতে চালু করা হয়েছে। নতুন বাংলাদেশি নিয়োগের জন্য নয়।”

উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনের উদ্যোগে ‘চাকরির খোঁজ’ নামে পোর্টালটি চালু করা হয়। 

ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ হাই কমিশনার বলেন, ‘চাকরির খোঁজ’ পোর্টালের মাধ্যম মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের জন্য নতুন দুয়ার উন্মোচিত হলো। বলা যায় শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সরাসরি সমন্বয়ের একটি মাধ্যম তৈরি হলো। 

তিনি জানান, করোনাকালে অনেক কর্মী চাকরি হারিয়েছেন আবার অনেক মালিক কাজের জন্য লোক খুঁজে পাচ্ছেন না। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি কোম্পানি শূন্য পদে কর্মী নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অনেক কোম্পানি যোগাযোগও করছে হাই কমিশনে। 

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বেনারকে বলেন, “মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশন সেখানকার অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি খোঁজার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। ওই অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার সরকারের প্রতিনিধি ছিলেন বলেও আমি জানি।”

মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারে আসলে কিছু দুষ্টু চক্র কাজ করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা দুই প্রান্তেই (মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশ) কাজ করে। তাদের স্বার্থ এবং ব্যবসার কারণেই প্রভাব খাটিয়ে তারা মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারটিকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করে।”

“আবারও যদি তাদের কারণে দূতাবাসের এই শুভ উদ্যোগ ভেস্তে যায় তাহলে প্রমাণ হবে এই দুষ্ট চক্র কখনো চায় না যে এই বাজারটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্যে আসুক,” বলেন শরিফুল হাসান।

তিনি মনে করেন, দূতাবাসের উচিত হবে পোর্টালটির বিষয়ে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষকে বোঝানো যাতে এটি চালু রেখে শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান করা যায়।

অনিয়মিত কর্মীদের সহযোগিতাই উদ্দেশ্য

হাই কমিশনার মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘চাকরির খোঁজ’ পোর্টালটি মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত শ্রমিকদের মধ্যে যারা চাকরি খুঁজছেন তাঁদের সহায়তার জন্য চালু করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার সরকার কর্তৃক ঘোষিত অবৈধ শ্রমিকদের বৈধ করার কর্মসূচিতে (রিক্যালিব্রেশন প্রোগ্রাম) সহায়তা করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। 

উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরে মালয়েশিয়া অবৈধভাবে থাকা শ্রমিকদের কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে বৈধ হওয়ার সুযোগ ঘোষণা করে। গত ১৬ নভেম্বর থেকে এই কার্যক্রম শুরু করেছে দেশটি, যা চলবে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত। 

“পোর্টালটি কেবল চলমান বৈধকরণ প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য হাই কমিশন চালু করেছে। কারণ, এই রিক্যালিব্রেশন প্রোগ্রামকে সহায়তা করার জন্য মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র এবং ইমিগ্রেশন অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় আমাদের অনুরোধ করেছে,” বলেন বাংলাদেশ হাই কমিশনার। 

“তা ছাড়া মালয়েশিয়ার বেশ কয়েকটি কোম্পানিও অনিবন্ধিত কর্মী নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে হাই কমিশনে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চেয়েছে। কারণ চলমান রিক্যালিব্রেশন প্রোগ্রামে অনিবন্ধিত বিদেশি কর্মী খুঁজে পেতে নিয়োগকর্তাদের জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের কাজ করার অনুমতি নেই,” জানান গোলাম সারওয়ার।

তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বৃহত্তর কল্যাণের দায়বদ্ধতার অংশ হিসাবে বাংলাদেশ হাই কমিশন এই চাকরি পোর্টালটি চালু করেছে। 

গোলাম সারওয়ার মনে করেন, এই উদ্যোগের গুরুত্ব বিবেচনা করেই এর ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম, প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন এবং মালয়েশিয়ার শ্রম বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল মোহাম্মদ আজরি আব্দুল ওয়াহাব অংশ নেন এবং বক্তব্য দেন। 

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগের জন্য দুদেশের মধ্যে চলমান আলোচনার বিষয়টি দ্রুত শেষ হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ওই কর্মকর্তা।

‘দায়িত্বহীন কাজ করেছে হাইকমিশন’

পোর্টালটি চালু হওয়ার এক সপ্তাহ পরে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাবি করেছেন, বাংলাদেশ হাই কমিশন ‘চাকরির খোঁজ’ পোর্টাল চালুর মাধ্যমে দায়িত্বহীন কাজ করেছে।

তিনি বলেন, বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের এ জাতীয় পদক্ষেপ বিদেশি কর্মীদের চাহিদা পূরণে মালয়েশিয়ার প্রচেষ্টাকে ক্ষুণ্ণ করে। 

বাংলাদেশ হাই কমিশন মালয়েশিয়া সরকারের পরামর্শ ছাড়াই এই পোর্টাল চালু করায় তিনি হতবাক হয়েছেন উল্লেখ করে সারভানান বলেন, “হাই কমিশনের পক্ষ থেকে এমন পদক্ষেপ নেওয়া অযৌক্তিক, বৈদেশিক কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা ও দায়িত্বের পরিপন্থী।” 

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি জাতীয় কর্মসংস্থান পোর্টাল পরিচালনা করে উল্লেখ করে তিনি জানান, এটি দেশীয় চাকরির শূন্য পদের বিজ্ঞাপন দেয়, যা বিদেশি কর্মী এবং প্রবাসীদের নিয়োগও পরিচালনা করে।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের চাকরির পোর্টালের বিষয়টি তিনি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন উল্লেখ করে মন্ত্রী সারাভানান বলেন, কারণ, এটি জনসাধারণকে বিশেষ করে স্থানীয় নিয়োগকর্তাদের বিভ্রান্ত করতে পারে। 

তিনি জানান, মালয়েশিয়ার আইন অনুযায়ী বিদেশী কর্মী নিয়োগ দেশটির শ্রম অধিদপ্তরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সি দ্বারা পরিচালিত হবে।

হাইকমিশনের পোর্টালটি তাঁর দেশে অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিক বাড়াবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা নানাভাবে শোষিত হতেও পারে যাতে মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।” 

সারাভানান বলেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বরাবর স্থানীয় শ্রমিকরা অগ্রাধিকার পেয়েছে এবং তারপরেই বিদেশি কর্মীদের বিবেচনা করা হবে। 

গত ৮ এপ্রিল পোর্টালটির ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন মালয়েশিয়ার শ্রম বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল মোহাম্মদ আজরি আব্দুল ওয়াহাব।

তবে ওই অনুষ্ঠানে ওয়াহাবের অংশগ্রহণ পোর্টালটির মালয়েশিয় সরকারের অনুমোদন বোঝায় না বলে বেনারকে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রম বিভাগের এক কর্মকর্তা।

ওয়াহাব মালয়েশিয়া সরকারের রিক্যালিব্রেশন প্রোগ্রাম বিষয়ে আলোচনার আমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে গিয়েছিলেন জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, যদি জানা থাকত যে ওই আমন্ত্রণটি অননুমোদিত একটি চাকরির পোর্টাল উদ্বোধনের সাথে সম্পর্কিত, তাহলে তাঁর বিভাগ সেই আমন্ত্রণটি গ্রহণ করত না।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কুয়ালালামপুর থেকে এস. আদি জুল।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন