ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের পুনর্বাসনে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকার প্রকল্প

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2021-07-28
Share
ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের পুনর্বাসনে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকার প্রকল্প করোনাভাইরাসের টিকা দেবার জন্য ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপেক্ষা করছেন বিদেশযাত্রী প্রবাসী শ্রমিকরা। ২৮ এপ্রিল ২০২১।
[বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

গত বছর ফেরত আসা প্রায় পাঁচ লাখ কর্মীর মধ্যে দুই লাখকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২৪৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে বুধবার একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা (একনেক)। 

সভায় সভাপতিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুল মান্নান।

“দেশের অর্থনীতি ও সমাজে বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করতেই দুই বছর মেয়াদি এই প্রকল্প,” জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “দেশের ৩২ জেলায় এটি বাস্তবায়ন করা হবে।” 

একনেক সভা শেষে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ হেল্পডেস্কের তথ্যের বরাত দিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) শরীফা খান বেনারকে জানান, দেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে ২০২০ সালে দেশে ফিরেছেন চার লাখ ৮০ হাজার প্রবাসী। 

“এই পাঁচ লাখ কর্মীর মধ্য থেকে প্রথম পর্যায়ে দুই লাখ কর্মীকে এককালীন সাড়ে ১৩ হাজার টাকা অনুদান হিসাবে দেয়া হবে এবং আরো পাঁচ হাজার টাকা তাঁদের প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশনের জন্য ব্যয় করা হবে,” যোগ করেন শরীফা খান।

‘উদ্যোক্তা হিসাবে প্রস্তুত করতে হবে’

বিদেশ ফেরত বাংলাদেশিদের সমাজে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি উদ্যোগকে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেন বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরীফুল হাসান। 

তবে তাঁর মতে, “সরকার যে অর্থ একজন অভিবাসীকে দেবে, সেটি আসলে তেমন কিছু নয়। সাড়ে ১৩ হাজার টাকা দিয়ে একজন মানুষের কোনো প্রয়োজন মিটবে না।” 

“এই প্রকল্প টেকসই করতে হলে বিদেশ ফেরত মানুষদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে অর্থের ব্যবস্থা করে তাঁদের উদ্যোক্তা হিসাবে প্রস্তুত করতে হবে। অথবা সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় যদি কাজের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলেই এটি টেকসই হবে,” বেনারকে বলেন শরীফুল হাসান।

তিনি বলেন, “যখন তাঁরা তাঁদের প্রয়োজন মেটানোর মতো নিয়মিত আয় করতে পারবেন, তখনই এ ধরনের উদ্যোগ সফল হবে।”

শরীফুল হাসান জানান, ২০২০ সাল থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ছয় লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন।

‘আরো প্রবাসী ফিরবেন’

মধ্যপ্রাচ্যসহ বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে কর্মীর চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রবাসীদের ফেরত আসা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে মনে করেন বেসরকারি অর্থনৈতিক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

“গত বছর থেকে বিদেশ থেকে পাঠানো প্রবাসী আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে,” জানিয়ে তিনি বেনারকে বলেন, এর অন্যতম কারণ হলো কাজের অভাবে যারা দেশে ফিরে আসবেন তাঁরা এক সাথে তাঁদের সব সঞ্চয় দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

“এ বছরও প্রবাসী আয়ের বৃদ্ধি চলছে। এটি আশার কথা নয়। যাঁরা একবার তাঁদের সব অর্থ দেশে পাঠাবেন, তাঁরা তো আর পরেরবার টাকা পাঠাতে পারবেন না,” মন্তব্য করে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর বলেন, “সুতরাং, আমাদের জন্য ভবিষ্যতে রেমিটেন্সের প্রবাহ বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হবে।” 

তিনি বলেন, “আমাদের বার্ষিক আমদানির পরিমাণ প্রায় ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং রপ্তানি ৩৭ বিলিয়ন ডলার। আমদানি-রপ্তানির এই ব্যবধান পূরণ হয় প্রবাসীদের রেমিটেন্স থেকে। আমরা যদি বছরে ২৪ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স রাখতে পারি তাহলে অর্থনীতিতে চাপ পড়বে না।” 

বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগকে ‘একটি প্রশংসনীয় ব্যাপার’ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিদেশ ফেরত কর্মীদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগাতে পারলে এবং করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাঁরা দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে আরো ভালো কাজের সুযোগ পাবেন। 

সরকারি হিসাবে গত বছর প্রবাসী কর্মীরা বাংলাদেশে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। এ বছরও রেমিটেন্সের উর্ধ্বগতি চলমান।

“বিদেশ থেকে আমাদের কর্মীরা দেশে ফিরে আসছেন। অনেকেই সেখানকার সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে সঞ্চয় দেশে পাঠিয়ে চলে আসছেন; এ জন্য মূলত রেমিটেন্স বাড়ছে,” বেনারকে বলেন ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান সৈয়দ সাইফুল হক।

“সৌদি আরবসহ অনেক দেশের কোম্পানিগুলো করোনার অজুহাতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা না দিয়ে খালি হাতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে,” জানিয়ে তিনি বলেন, “এই শ্রমিকদের বেতন আদায়ের জন্য আমরা ‘ওয়েজ থেফট’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করছি। এর মাধ্যমে আমরা শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আদায়ের ব্যবস্থা করব।”

সাইফুল হক বলেন, “সরকার যদি এই প্রকল্প সফল করতে চায় তাহলে বেসরকারি সংস্থা এবং সরকারি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।” 

সরকার আন্তরিক কিন্তু ‘কর্মকর্তারা দুর্নীতি করেন’

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বাসিন্দা সোলেইমান মিয়া (৪৫) বাহরাইনে একটি হোটেলে ২০ বছর গাড়ি চালক হিসাবে কাজ করেছেন। গত বছর ১২ মার্চ করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এরপর থেকে সেখানে আর ফিরে যেতে পারেননি। ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

তিনি বুধবার বেনারকে জানান, “সরকার বলছে আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করতে চায়। আমি মনে করি সরকারের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা, যাদের কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় তাঁদের অনেকেই হয়রানি ও দুর্নীতি করেন। ফলে আমরা প্রবাসীরা সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধা পাই না।” 

সোলেইমান মিয়া বলেন, “আমি ২০ বছর বাহরাইনে গাড়ি চালিয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো দেশে আমি গাড়ি চালাতে পারব। কিন্তু কিছুদিন আগে আমি বাংলাদেশে গাড়ি চালকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করি। বাহরাইনের লাইসেন্স দেখানোর পরও আমাকে সহজে লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। অথচ আমাকে লাইসেন্স দেওয়া হলে আমি কিছু আয় করতে পারতাম।”

“তাই সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও সরকারের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে এই প্রকল্প থেকে খুব বেশি কিছু আশা করি না,” বলেন সোলেইমান মিয়া।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন