Follow us

আবারও ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ পরিকল্পনা করছে আনসার আল ইসলাম: র‌্যাব

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-10-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া 'আনসার আল ইসলামের চারজনকে সদস্য'কে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা হয়। ঢাকা, অক্টোবর ২১, ২০১৯।
র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া 'আনসার আল ইসলামের চারজনকে সদস্য'কে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা হয়। ঢাকা, অক্টোবর ২১, ২০১৯।
ছবি র‌্যাবের সৌজন্যে।

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম দেশে আবারও ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ জন্য তারা নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে।

রাজধানী ঢাকা থেকে এ সংগঠনের সাথে জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেপ্তারের পরে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব -৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক।

রোববার রাতে গাবতলী ও সাভারের আমিন বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে বেনারকে জানান র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান।

মোজাম্মেল হক বলেন, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের এই সদস্যের সঙ্গে আমরা আরও ২০-২৫ জন জঙ্গি সদস্যদের সঙ্গে লিঙ্ক পেয়েছি। তাদের সবাইকে আটকের চেষ্টা চলছে।’

এই নিয়ে ১১ দিনের মধ্যে আনসার আল ইসলামের আটজন সদস্যকে আটক করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে গত ১০ অক্টোবর রাতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে এই সংগঠনের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। তারাও ‘নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য’ ঢাকায় এসে ধরা পড়েন বলে জানানো হয়।

সোমবার সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, “আটক জঙ্গিদের পরিকল্পনা ছিল, যারা দেশে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় বাধা দেবে শাস্তি হিসেবে ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ মাধ্যমে তাদের হত্যা করা। আর এ উদ্দেশ্যে নিজেদের কাছে সব সময় চাপাতি রাখত তারা।”

বিশ্লেষকেরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে জঙ্গিরা দুর্বল হয়ে পড়লেও জঙ্গিবাদ নির্মূল হয়নি। তবে দূর্বল হয়ে পড়ায় দেশে বড় ধরনের নাশকতা করার আশঙ্কা নেই বলেও মনে করেন তাঁরা।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মে. জে. এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.) বেনারকে বলেন, “হলি আর্টিজান হামলার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে জঙ্গিরা শক্ত ভিত গড়তে পারছে না ঠিকই,তবে তারা থেমে নেই। বারবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।”

মোহাম্মদ আলী শিকদার মনে করেন, “দেশীয় এসব জঙ্গিরা এখন অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ কারণে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা নেই বলে মনে করি। তবে আইনশঙ্খলা বাহিনীকে সর্বদা তৎপর থাকতে হবে।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ থেকে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ করলেও নির্মূল করা যাচ্ছে না। কারণ, দেশে এখনো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা যায়নি। জঙ্গিবাদের বীজ এই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মধ্যেই বপন করা রয়েছে।”

মোজ্জাম্মেল হক বলেন, “আটক ৪ জঙ্গি সদস্য এখন আনসার আল ইসলামের হয়ে কাজ করলেও আগে তারা হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। পরবর্তীতে হরকাতুল জিহাদ ভেঙে গেলে আনসার আল ইসলামে যোগদান করে।”

তাদের কাছ হতে আনসার আল ইসলামের বিভিন্ন ধরনের উগ্রবাদী সম্পর্কিত বই, ভিডিও, কবিতা, বয়ান, লিফলেটসহ মোবাইল, ল্যাপটপ ও চাপাতি উদ্ধার করা হয় বলেও জানানো হয়।

যেভাবে তারা জঙ্গিবাদে

রোববার রাতে গ্রেপ্তার হন যারা তারা হলেন- মুফতি সাইফুল ইসলাম (৩৪), সালিম মিয়া (৩০), জুনায়েদ (৩৭) ও আহম্মেদ সোহায়েল (২১)।

র‌্যাব জানায়, মুফতি সাইফুল ইসলাম আনসার আল ইসলামের শীর্ষ জঙ্গিদের মধ্যে একজন। তিনি রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকায় ‘নৈশ মাদ্রাসায়’ শিক্ষকতা করেন। ছাত্র জীবনে হরকাতুল জিহাদের সাথে যুক্ত ছিলেন সাইফুল। ওই সংগঠন  নিষিদ্ধ হলে সক্রিয়তা কমালেও সশস্ত্র জঙ্গিবাদে অংশ গ্রহণে আগ্রহী ছিলেন। সেই আগ্রহ থেকেই আনসার আল ইসলামে যোগ দেন তিনি।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য থেকে র‌্যাব জানায়, সাইফুলের হাত ধরেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন আটক আরেক জঙ্গি সালিম মিয়া। রাজধানীতে একটি লিফট কোম্পানির এই কর্মচারীর ২০১৩ সালে নৈশ মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে সাইফুলের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেখানে উগ্রবাদের কথা শুনতে শুনতে আনসার আল-ইসলামে সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন। সংগঠনের বিভিন্ন ভিডিও, বইপত্র সংগ্রহ ছাড়াও সংগঠন পরিচালনায় চাঁদা দিতেন সালিম।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত জুনায়েদ হোসেন ছাত্রজীবনে হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সাভারের হেমায়েতপুরে একটি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং শিক্ষক। তিনিও সাইফুলের মাধ্যমে আনসার আল-ইসলামের জঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তাঁর মাদ্রাসায় প্রতিনিয়ত এই সংগঠনের মিটিং হতো।

এ ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত আহম্মেদ সোহায়েলের মাহাদি এক ব্যক্তির সঙ্গে অ্যাপসের মাধ্যমে পরিচয় হয়। তার মাধ্যমেই আনসার আল ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। পরে তাদের কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই সংগঠনের যোগ দেন। নিষিদ্ধ এই সংগঠনটির সাথে তিন বছর ধরে জড়িত তিনি।

টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনা ছিল

মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের জানান, দেশের প্রচলিত শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করাই আনসার আল ইসলামের মূল উদ্দেশ্য। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জানান, তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতাকারীদের ওপর তারা আকস্মিক আক্রমণ করে কঠোর শাস্তি বা টার্গেট কিলিং করে থাকে।

তিনি জানান, টার্গেট কিলিংয়ের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় আগ্নেয়াস্ত্রের পরিবর্তে চাপাতি ব্যবহার করে।

র‌্যাব জানায়, জঙ্গি তৎপরতা, প্রশিক্ষণ ও করণীয় সম্পর্কে তারা নিজেদের মধ্যে অনলাইনে সুরক্ষিত অ্যাপস বা ব্রাউজারের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। নিয়মিতভাবে তাদের সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে।

মোজাম্মেল হক জানান, এই দলের সদস্যরা এন্ড্রয়েট মোবাইল বা ল্যাপটপ এর মাধ্যমে বিভিন্ন সুরক্ষিত অ্যাপস, মেসেঞ্জার ও ব্রাউজার ইত্যাদি ব্যবহার করে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে উগ্রবাদী সংবাদ, বই, উগ্রবাদী ব্লগ, উগ্রবাদ উৎসাহ মূলক ভিডিও আপলোড ও শেয়ার করে নিয়মিত নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল।

তিনি জানান, এরা সহজে কেউ কারও সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে না, ফলে  কেউ কাউকে চিনে না। তবে কোনও নাশকতার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, গোপনীয় তথ্য সরবরাহ ও গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দেখা করে থাকে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন