পদ্মা সেতু: রয়েছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা

আহম্মদ ফয়েজ
2022.06.17
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
পদ্মা সেতু: রয়েছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা পদ্মা সেতু। ছবিটি শরীয়তপুর জেলার জাজিরা প্রান্ত থেকে তোলা। ১৪ জুন ২০২২।
[বেনারনিউজ]

নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতুর সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোকে অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, এ জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর পরিকল্পনা।

এদিকে পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করেই আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রচার প্রচারণা ও কর্মসূচি নিয়ে ভাবছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতুটি চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে সড়ক পথে যোগাযোগ শুরু হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষের সমাগমের পাশাপাশি সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরির লক্ষে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬.১৫ কিলোমিটার এই পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড।

২৫ জুন সকাল ১০টায় পদ্মা সেতু মাওয়া প্রান্তে প্রথম ফলক এবং বেলা ১১টার দিকে জাজিরা প্রান্তে দ্বিতীয় ফলক উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর এটিই হবে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জনসভা যেখানে তিনি সশরীরে উপস্থিত থাকবেন।

সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে

পদ্মা সেতুকে জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, সরকারের উচিত সেতুটিকে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা।

“পদ্মা সেতু এলাকা ঘিরে ১৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা ছিল” জানিয়ে তিনি বলেন, “জাতীয় অর্থনীতিতে সেতুটির অবদান নিশ্চিত করতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।”

পদ্মা সেতু দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কমপক্ষে ১.২ শতাংশ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

“এই সেতুটি চালু হলে ইকো-পার্ক, ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পার্ক, ট্যুরিজম ও অন্যান্য যেসব কর্মকাণ্ড গড়ে উঠবে তাতে প্রচুর কর্মসংস্থানও তৈরি হবে,” বলেন মোস্তাফিজুর রহমান।

পদ্মা সেতু ব্যবহারের জন্য একটি ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

“সেতুটি নিজেই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির কিছু সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু, নতুন বাণিজ্য ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য একটি ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা আবশ্যক,” বেনারকে বলেন তিনি।

এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি’র এক স্টাডিতে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু চালু হলে এটি জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

সেতু থেকেই শুরু হবে নির্বাচনী প্রচারণা

দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অবকাঠামো পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে ২৫ জুন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এই লক্ষে আওয়ামী লীগ নানা প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বেনারকে নিশ্চিত করেছেন দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতা।

পদ্মা সেতুর সরাসরি উপকারভোগী ঢাকা, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের অন্তত ২১টি জেলায় ৭৬টি সংসদীয় নির্বাচনী আসন রয়েছে। সংসদ সচিবালয় ও সরকারী তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকাগুলোর জনসংখ্যা তিন কোটিরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ।

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ২৫ জুন আওয়ামী লীগ জনসভাসহ দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করবে বলে বেনারকে জানান দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম।

তিনি বলেন, “উদ্বোধনী উৎসব কড়া নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে...সেদিন শরীয়তপুরের জাজিরা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত সিসিটিভি নজরদারি থাকবে।”

“আগামী নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ যেসব প্রচার-প্রচারণার উপকরণ তৈরি করবে, সেগুলোতে এবং সভা সমাবেশে পদ্মা সেতু বিশেষ গুরুত্ব পাবে,” নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক।

আগামী বছরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের শুরুতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছ।

“আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে যে সংসদীয় আসনের জনগণ যারা সেতুটি থেকে সরাসরি উপকৃত হবেন তারা আগামী সাধারণ নির্বাচনে 'নৌকা' ভোট দেবেন,” বেনারকে বলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক।

AB9I5404-01.jpeg
মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া প্রান্ত থেকে তোলা পদ্মা সেতু। ১৪ জুন ২০২২। [বেনারনিউজ]

নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর নারীদের মূল স্রোতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেও সহায়তা করবে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু ইন্সটিটিউট অব কমপারেটিভ লিটারেচার অ্যান্ড কালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ঈশিতা আক্তার, যিনি জেন্ডার ইস্যু নিয়ে কাজ করছেন।

তিনি বলেন, সেতুটি নারীদের জন্য “উচ্চ শিক্ষা, চিকিৎসা, বাণিজ্য এবং আইনি সহায়তা প্রাপ্যতার অধিকারকে সহজ করবে।”

সেতুর কারণে গ্রামীণ নারীরা উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখারও সুযোগ পাবেন বলে মনে করেন তিনি।

“দূরত্ব ও রাত্রীকালীন যাত্রার” বিভিন্ন সমস্যার কারণে বর্তমানে ঢাকায় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগদান করা একজন নারীর জন্য “খুবই কঠিন কাজ,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন বরগুনার জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ফৌজিয়া খানম।

বর্তমান বরগুনা থেকে ঢাকায় আসতে যেখানে কমপক্ষে ১৩ ঘণ্টা লাগে, পদ্মা সেতু চালু হলে মাত্র ছয় ঘণ্টা সময় লাগবে জানিয়ে তিনি বলেন, সেতুটি নারীদের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতেও সাহায্য করবে।

নিজের টাকায় সেতু

পদ্মা সেতু প্রকল্পের নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সাথে ঋণচুক্তি সই করে সরকার। কিন্তু নির্মাণকাজের তদারক করতে পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে বিশ্বব্যাংক। এরপর একে একে সব অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুত অর্থায়ন স্থগিত ঘোষণা করে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সেতু বিভাগরে সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ সাত জনের বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অবশ্য ২০১৪ সালে তদন্ত শেষে দুদক জানিয়ে দেয়, এই প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

২০১৭ সালে কানাডার টরন্টোর এক আদালত জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত প্রমাণ পাননি তাঁরা।

তার আগে ২০১২ সালের ৯ জুলাই মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদ্মা সেতুর জন্য অর্থ না নেওয়ার কথা জানিয়ে দেয় সরকার।

“বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু নির্মাণ থেকে সরে দাঁড়ায়, তখন শেখ হাসিনা সংসদে বলেছিলেন, আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হবে। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন এবং তাঁর মতামত জানিয়েছিলেন যে আমরা কি আমাদের নিজস্ব তহবিল দিয়ে একটি সেতু তৈরি করতে পারি না! আমরা পারি,” গত সপ্তাহে পদ্মা সেতু এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

প্রধানমন্ত্রী সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, নোবেল বিজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস ও বিশ্বব্যাংকের প্রধানসহ সবাইকে আমন্ত্রণ জানাতে বলেছেন বলে জানান তিনি।

ব্যর্থতা থেকে চোখ সরাতে চাইছে সরকার’

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ও এই সেতুটি নিয়ে সরকারের সার্বিক বক্তব্য অন্যান্য ব্যর্থতা থেকে জনগণের চোখ সরানোর চেষ্টা বলে মনে করে বিরোধী দল বিএনপি।

দলটির অন্যতম মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বেনারকে বলেন, “যেহেতু সরকার কর্তৃক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, ভোটাধিকার হরণ এবং দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ঘটনাগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়ে উঠেছে, তাই ক্ষমতাসীনরা পদ্মা সেতুকে নিয়ে অতিকথনের মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে সরানোর চেষ্টা করছে।”

পদ্মা সেতু নির্মাণকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর একক অর্জন হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করছেন মন্তব্য করে রিজভী বলেন সরকার এমন এক সময় পদ্মা সেতুর ‘মেগা উদ্বোধনের’ আয়োজন করছে যখন সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সহ প্রায় সকল পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধির ফলে নিয়মিত খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বেনারকে বলেন, “প্রায় সকল ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকছে না। মানুষের কাছে এখনো পরিষ্কার নয় যে পদ্মা সেতু উদ্বোধন নিয়ে এসব আয়োজন কার, সরকারের নাকি আওয়ামী লীগের?”

এই ধরনের চর্চার ফলে সুশাসন বাধাগ্রস্ত হয় দাবি করে বদিউল বলেন, “এতে করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন