বিশ্বব্যাংকের গবেষণা: দেড় দশকে তিন গুণ বেড়েছে প্লাস্টিকের ব্যবহার

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2021-12-20
Share
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা: দেড় দশকে তিন গুণ বেড়েছে প্লাস্টিকের ব্যবহার ঢাকা সদরঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকার মালামাল পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখছেন এক শ্রমিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর তলদেশে কয়েক মিটার পুরু পলিথিন ও প্লাস্টিকের স্তর পড়ে নদীকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ৫ জুন ২০১৭।
[বেনারনিউজ]

প্রায় দুই দশক আগে আগে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে বাংলাদেশ পলিথিন শপিং ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। তবে, সেই নিষেধাজ্ঞার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে জনপ্রতি বার্ষিক পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে কমপক্ষে তিনগুণ।

এমন তথ্য উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক গবেষণায়। সোমবার ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের উপস্থিতিতে সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

“টুয়ার্ডস অ্যা মাল্টিসেক্টরাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর সাসটেইনেবল প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ” শিরোনামে এই প্রতিবেদনে প্লাস্টিকের পরিমাণ কমিয়ে এর পুনর্ব্যবহারে ওপর জোর দেয়া হয়।

“গবেষণায় আমরা দেখতে পেয়েছি যে ২০০৫ সালে শহরাঞ্চলে প্রতি বছর জনপ্রতি প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল তিন কেজি। ২০২০ সালে, অর্থাৎ গত ১৫ বছরে আমাদের দেশে বার্ষিক জনপ্রতি প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ তিনগুণ বেড়ে নয় কেজিতে দাঁড়িয়েছে,” বেনারকে বলেন বিশ্বব্যাংকের এই গবেষণা দলের সদস্য বুশরা নিশাত।

তবে ঢাকা শহরে “জনপ্রতি বছরে প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ সাড়ে ২২ কেজি,” বলে জানান তিনি।

“উন্নত বিশ্বে জনপ্রতি প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ ১০০ কেজির মতো,” জানিয়ে বুশরা নিশাত বলেন, “কিন্তু সেখানে প্লাস্টিক তেমন সমস্যা তৈরি করে না। কিন্তু আমাদের দেশে জনপ্রতি প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ কম হলেও আমাদের দেশে প্লাস্টিক ও পলিথিন বিরাট সমস্যা।”

“এর মূল কারণ, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবস্থাপনা। উন্নত বিশ্বে প্লাস্টিক যত্রতত্র না ফেলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয় এবং সেখান থেকে পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। এবং জনগণ সেগুলো পুনরায় ব্যবহার করেন,” বলেন বুশরা নিশাত।

“কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ ব্যবহারের পর যেখানে সেখানে ফেলে দেয়। সেগুলো নর্দমায়, নদী, নালা, খাল, বিল, সমুদ্র সব স্থানে চলে যায়। কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই,” বলেন তিনি।

“বর্তমান বিশ্বে আমরা পলিথিন ও প্লাস্টিক ছাড়া চলতে পারব না,” জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদেরকে প্লাস্টিকের টেকসই ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। মূল কথা হলো প্লাস্টিকের পরিমাণ কমাতে হবে, পুনরায় ব্যবহার করতে হবে এবং পুন:চক্রায়ন করতে হবে।”

সাভারের আমিন বাজারে একটি কারখানায় ব্যবহার করা প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত করে আবার নতুনভাবে ব্যবহার উপযোগী করে তুলছেন একজন শ্রমিক। ২২ নভেম্বর ২০২০। [সাবরিনা ইয়াসমীন/বেনারনিউজ]
সাভারের আমিন বাজারে একটি কারখানায় ব্যবহার করা প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত করে আবার নতুনভাবে ব্যবহার উপযোগী করে তুলছেন একজন শ্রমিক। ২২ নভেম্বর ২০২০। [সাবরিনা ইয়াসমীন/বেনারনিউজ]

প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করতে হবে

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের ফলাফলটি “উদ্বেগের” বলে বেনারকে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জিয়াউল হক।

তিনি বেনারকে বলেন, “পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার আমাদের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে। এখনই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।”

পলিথিন ও প্লাস্টিক সস্তা ও সহজলভ্য হবার কারণে অনেকেই সেগুলো একবার ব্যবহার করে ফেলে দেন জানিয়ে তিনি বলেন, “প্লাস্টিকের পরিমাণ কমাতে আমাদেরকে অবশ্যই একই প্লাস্টিক পুনরায় ব্যবহার করতে হবে। একবার ব্যবহার করে যত্রতত্র ফেলে দেয়া যাবে না। সেটি করা গেলে প্লাস্টিকের পরিমাণ কমে যাবে।”

“সরকার মনে করে পলিথিনের পরিমাণ কমাতে হবে, পুনরায় ব্যবহার করতে হবে এবং পুনর্ব্যবহার করতে হবে,” বলেন জিয়াউল হক।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে ২০০২ সালের শুরুতে পলিথিনের শপিংব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু সেই নিষেধ কাজে আসেনি। বরং ক্রমেই পলিথিনের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০১৮ সালে জাতিসংঘ পরিবেশ সংস্থার এক গবেষণায় দেখা যায় ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন, উৎপাদন পর্যায়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণের অভাব, পলিথিনের বিকল্প গ্রহণে কোনো প্রণোদনা না থাকা ইত্যাদির কারণে সেই নিষেধ ব্যর্থ হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, “আমাদের দেশে পলিথিন বন্ধ করা হয়। কিন্তু জনগণকে পলিথিনের সহজলভ্য ও সস্তা বিকল্প দেয়া হয়নি। সেকারণে পলিথিন আবার ফিরে এসেছে। পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছে।”

তিনি বলেন, “পলিথিন আমাদের পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি সাধন করছে, মাটির উপরিস্তর নষ্ট করছে, পানি দূষণ করছে, নদীনালা সব বন্ধ করে দিচ্ছে।”

বুড়িগঙ্গার মতো নদীর তলদেশে “কয়েক মিটার পুরু পলিথিন ও প্লাস্টিকের স্তর পড়েছে,” জানিয়ে হাফিজুর রহমান বলেন, “এগুলো আমাদের নদীকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।”

তিনি বলেন, “বর্তমানে অবস্থা এমন যে, আমরা পলিথিন ও প্লাস্টিক ছাড়া চলতে পারব না। সেকারণে প্লাস্টিক রিসাইকেল করতে হবে, পুনরায় ব্যবহার করতে হবে।”

“পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহারের আরেকটি বড়ো সমস্যা হলো, এগুলো আবর্জনার সাথে ল্যান্ডফিলে চলে যায় এবং সেখানে ক্ষতিকারক মিথেন গ্যাস উৎপাদিত হয়,” বলেন হাফিজুর রহমান।

প্লাস্টিকের বিকল্প চটের বস্তার দাম বেশি

২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ইনভায়রনমেন্টাল’ এক প্রতিবেদনে জানায়, পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণের সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্র রয়েছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখে।

পলিথিন ব্যবহার কমাতে এবং পরিবেশবান্ধব পাট ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য ২০১০ সালে মোড়কে পাটের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন পাশ করে সরকার।

এই আইন অনুযায়ী, ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনি প্যাকেট করার জন্য অবশ্যই পাটের ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। এই আইনও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

পাশাপাশি সরকার আরও ১১টি পণ্যের জন্য পাট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে উদ্যোগ নিয়েছে।

“সরকার ধান, চাল, গমের জন্য পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। এই উদ্যোগ ভালো। কিন্তু এর সমস্যাও রয়েছে,” বেনারকে বলেন মিরপুর-১২ এলাকার চালের আড়তের মালিক মো. মতিউর রহমান।

তিনি বলেন, “একটি প্লাস্টিকের বস্তা ১০ টাকায় পাওয়া যায়। কিন্তু একটি চটের বস্তার দাম ৫০ টাকার কম হয় না। সেক্ষেত্রে চালের দাম বেড়ে যায় এবং চালের দাম বাড়লে আবার হইচই পড়ে যায়।”

মতিউর বলেন, “সমস্যা দুদিকেই। আমরা যাব কোথায়?”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন