চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে চেয়ে করা খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ

শরীফ খিয়াম
2020.02.27
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
200227_Khaleda_Zia_bail_1000.jpg খালেদার জামিন আবেদন খারিজের পর হাইকোর্ট চত্ত্বরে বিক্ষোভ করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
[বেনারনিউজ]

কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সর্বশেষ জামিন আবেদনটি বৃহস্পতিবার খারিজ করে দিয়েছে আদালত।

দুর্নীতির দুই মামলায় ১৭ বছরের দণ্ড নিয়ে কারান্তরীণ এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) দেওয়া চিকিৎসা প্রতিবেদনের ওপর শুনানি শেষে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও একেএম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেয়।

আদেশে বেঞ্চের জেষ্ঠ্য বিচারক বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, “মনে রাখতে হবে, তিনি একজন বন্দি। সাধারণ অন্য রোগীদের মতো সুযোগ সুবিধা তিনি পাবেন না। জেল কোড ও নিয়ম নীতি মেনেই তাঁকে চিকিৎসা নিতে হবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রতিক্রিয়ায় ‘ন্যায়বিচার পাননি’ দাবি করে খালেদার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, “এ আদেশে আমরা সংক্ষুব্ধ।”

“আদালতকে আমরা বলেছি, তাঁর জীবন অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে। যেখানে অপারেশন হয়েছিল, সেই যুক্তরাজ্যের লন্ডনেই তাঁর উন্নত চিকিৎসা হওয়া দরকার,” বলেন তিনি।

এদিকে “সরকার ইচ্ছে করেই খালেদা জিয়াকে আটকে রেখেছে,” মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদে বেনারকে বলেন, “আমরা হাইকোর্টের খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করব।”

তবে ‘ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছা ছাড়া’ খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয় বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন।

তাঁর মতে, বৃহস্পতিবারের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে সেটাও খারিজ হয়ে যাবে।

“সরকার চাইলে ‘প্যারোলে’, তথা নির্বাহী আদেশে বা ফৌজধারী কার্যবিধির ৪০১ ধারায় আদালতের মাধ্যমেও সাজা স্থগিত রেখে তাঁকে চিকিৎসার জন্য মুক্তি দিতে পারে,” যোগ করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক অরুণ কুমার গোস্বামী বেনারকে বলেন, “আইনগত ও রাজনৈতিক দুইভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি।”

“স্রেফ ব্যর্থ নেতৃত্বের জন্য এই দেশের ডানপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনীতির একজন সফল নেত্রীকে আমরা হারাতে যাচ্ছি,” নিজ দলের কর্মকাণ্ডে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন খন্দকার মাহবুব।

বিএনপির আইনজীবীরা বলছেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত অবস্থা আগের থেকে এখন অনেক খারাপ। তিনি পাঁচ মিনিটও দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। নিজের হাতে খেতে পারেন না। খাবার খেলেও প্রায়ই বমি করেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজার রায় ঘোষণার পর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়া হয়। একই বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও তাঁকে সশ্রম কারাদণ্ড দেয় আদালত। স্বাস্থ্যগত কারণে গত বছরের এপ্রিল থেকে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন খালেদা জিয়া।

যেভাবে খারিজ হলো আবেদন

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার পক্ষে করা জামিন আবেদনে বলা হয়েছিল, তিনি গুরুতর অসুস্থ, তাঁর উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। বিএসএমএমইউ হাসপাতালে তাঁর উন্নত চিকিৎসা হচ্ছে না, তাঁকে দ্রুত যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন।

এর প্রেক্ষিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের কাছে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিবেদন চায় আদালত।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ে বুধবার বিকেলে প্রতিবেদনটি পৌঁছায় বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ। বৃস্পতিবার সকালে তা আদালতে পড়ে শোনান বিচারপতি ওবায়দুল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, খালেদা জিয়া ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, অ্যাজমা, বাতজ্বর ও কাশিসহ ব্যাক পেইনে ভুগছেন। তাঁকে অ্যাডভ্যান্সড ট্রিটমেন্ট দেয়ার বিষয়ে তাঁর মতামত জানতে চেয়েছিল সাত সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। তবে তিনি বিএসএমএমইউর অধীনে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে সম্মতি দেননি।

শুনানি শেষে জামিন আবেদন খারিজ করলেও খালেদা জিয়া মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত চিতিৎসা নিতে সম্মতি দিলে তা দ্রুত শুরু করতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

তবে খালেদা জিয়াকে “যে ধরনের চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন তা দেওয়ার অভিজ্ঞতা ওই মেডিকেল বোর্ডের কোনো চিকিৎসকেরই নেই,” বলে মন্তব্য করেন খন্দকার মাহবুব।

বিক্ষুব্ধ বিএনপি, খুশি দুদক
খালেদার জামিন আবেদন খারিজের পরপরই আদালত চত্ত্বরে বিক্ষোভ শুরু করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। এর কিছুক্ষণ পরই আগামী শনিবার রাজধানীসহ সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি।

দলটির দাবি, বর্তমান সরকারের নির্দেশেই খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করা হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, “এটা একান্তই আদালতের ব্যাপার। এখানে সরকারের কিছু করণীয় নেই।”

অন্যদিকে খালেদার জামিন আবেদন খারিজের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বেনারকে বলেন, “এই রায়ে দুদক খুবই খুশি। কারণ আমরা অনেক কষ্টে তাঁর বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করতে পারার কারণেই তিনি সাজা খাটছেন।”
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগে অন্যদের সাথে বেগম খালেদার নামে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করেছিল দুনীতি দমমন কমিশন (দুদক)।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।