Follow us

জাতীয় স্লোগান হবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ‘জয় বাংলা’: হাইকোর্ট

পুলক ঘটক
ঢাকা
2020-03-10
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার দোহারে মুক্তিযোদ্ধাদের উল্লাস। ছবিটি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের তোলা। মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত প্রেরণাদায়ক স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে মঙ্গলবার জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার দোহারে মুক্তিযোদ্ধাদের উল্লাস। ছবিটি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের তোলা। মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত প্রেরণাদায়ক স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে মঙ্গলবার জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
[সৌজন্যে: আনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশন]

মুক্তিযুদ্ধের সময় সর্বজন ব্যবহৃত প্রেরণাদায়ক স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। “জাতীয় সব অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশে প্রত্যেকের বক্তব্য শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণের জন্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে” বেনারকে জানিয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাসার।

‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান করার প্রশ্নে প্রায় আড়াই বছর আগে জারি করা একটি রুলের শুনানি শেষে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার এ রায় দেয়।

জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান ঘোষণার নির্দেশনা চেয়ে এর আগে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী ড. বশির আহমেদ। ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর ওই রিটের শুনানি নিয়ে রুল জারি করেছিল হাইকোর্ট।

রিটকারী আইনজীবী ড. বশির আহমেদ বেনারকে বলেন, “পৃথিবীর ৬০টি দেশে জাতীয় স্লোগান আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য যে আমাদের জাতীয় ঐক্য ও চেতনার উচ্চারণ ‘জয় বাংলা’কে স্বাধীনতার এতদিন পরেও জাতীয় স্লোগান হিসেবে পাই নাই। হাইকোর্টের রায়ে সেই ঘাটতি লাঘব হলো।”

কী আছে রায়ে?

রায়ে বলা হয়, “একাত্তরে যখন মহান মুক্তিযুদ্ধ চলে তখন দেশে ও বিদেশে একটাই স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে গুলি করার আগ মুহূর্তেও এদেশের মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দিয়েছে। সর্বোপরি এদেশের ধর্মনিরপেক্ষ স্লোগানই হচ্ছে জয় বাংলা।”

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “জয় বাংলা জাতীয় ঐক্যের স্লোগান। জয় বাংলা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় স্লোগান এবং জয় বাংলা ৭ মার্চের ভাষণের সাথে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।”

“আমরা ঘোষণা করছি যে, জয় বাংলা বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হবে,” বলা হয় আদেশে।

সকল জাতীয় দিবস এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদাধিকারীগণ ও রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকর্তা সরকারি অনুষ্ঠানের বক্তব্য শেষে জয় বাংলা স্লোগান উচ্চারণ যেন করেন, সে জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

“সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যাসেম্বলি সমাপ্তির পরে ছাত্র শিক্ষকগণ যেন জয় বাংলা স্লেগান উচ্চারণ করেন, তার জন্য বিবাদীরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন," বলা হয় নির্দেশনায়।

আদালতের এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন ৩ মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়।

কীভাবে দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো?

আদালত জয় বাংলাকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা করলেও বিষয়টিকে সার্বজনীন হিসেবে নিতে রাজি নয় রাজনৈতিক দলগুলো। বরং আদালতের এই ধরনের রায়ে বিব্রতবোধ করার কথা জানিয়েছেন কেউ কেউ।

আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেছেন, “বিএনপিসহ যারা জয় বাংলা স্লোগান দিতে আগে লজ্জা পেত, আমি আশা করি তারা এখন আর জয় বাংলা ম্লোগান দিতে লজ্জা পাবে না। তারা এখন থেকে জয় বাংলা ম্লোগান দেবে।”

তবে বিষয়টি নিয়ে এখনই মুখ খুলতে রাজি নন বিএনপি নেতারা। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতার সঙ্গে এ বিষয়ে বেনারের কথা হয়েছে, তাঁরা রায়কে স্বাগতও জানাননি, প্রত্যাখ্যানও করেননি।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশারফ হোসেন বেনারকে বলেন, “এটি নিয়ে এখনো মন্তব্য করার সময় আসেনি। আমরা দলীয়ভাবে আলোচনা করব। আমি এখনই মন্তব্য করতে চাই না।”

“আমি কোনও মন্তব্য করব না,” এক বাক্যে বেনারকে জানিয়ে দেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বেনারকে বলেছেন, “এই একটি বিষয় কোর্টের কাছে কেন গেল – এটা শুধু বিষ্ময়ের নয়, আমি অপমানিত বোধ করছি। কোর্টের দ্বারাস্থ কেন হবে?”

আদালতের এই রায়কে নিজেদের দলীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করবেন কি-না জানতে চাইলে সেলিম বলেন, “জাতীয় স্লোগান বলতে কী বোঝায়? আদালত কি কোনো সংজ্ঞা দিয়েছে? আমি কোনো সংজ্ঞা দেখলাম না।”

তবে আদালতের রায়কে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন সংসদে বিরোধীদল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এমপি। বেনারকে তিনি বলেছেন, “স্বাধীনতার সময় জয় বাংলা সবাই বলত। এটা করলে খারাপ হবে না।”

তবে দলগতভাবে স্লোগান হিসেবে বাস্তবায়ন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা আদালতের রায় পর্যালোচনা করে দলে আলোচনা করব। তারপর সিদ্ধান্ত নেব।”

জয় বাংলা কি ঐক্য আসবে?

সকল দল জয়বাংলাকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহার না করলে এ নিয়ে জাতীয় ঐক্যমত হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের অবদান ও গুরুত্বকে স্বীকার করে বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্যারিস্টার শাহদীন মালিক বেনারকে বলেছেন “আদালতের রায়ের মাধ্যমে বিষয়টি বাস্তবায়ন করা কঠিন।”

“স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে সব ছাত্র শিক্ষককে জয় বাংলা বলতে বলা হয়েছে। এখন কোনো ছাত্র যদি উচ্চারণ না করে, তাকে বাধ্য করা দুস্কর,” বলেন তিনি।

“অন্য কোনো দেশে এধরনের স্লোগান আদালতের রায়ে হয় বলে জানা নেই। তাই রায়ের চেয়েও সবাইকে এই স্লোগানে উদ্বুদ্ধ করা হবে প্রধান দায়িত্ব,” বলেন শাহদীন মালিক।

“জয় বাংলা গ্রেট স্লোগান এতে কোনো সন্দেহ নেই। মুক্তিযুদ্ধে এই শব্দগুচ্ছ জাতীয় মুক্তির প্রেরণাদায়ক হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। জয় বাংলা দেশ প্রেমের অংশ। কিন্তু আদালতের রায়ে দেশপ্রেম প্রতিষ্ঠিত করা যায় না,” বেনারকে বলেন আর্টিকেল ১৯ এর বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক পরিচালক ফারুক ফয়সাল।

“চাপিয়ে দিতে গেলে মানসিক বিচ্ছিন্নতা বরং বাড়ে,” মন্তব্য করে ফয়সাল বলেন “সবকিছু দলীয়করণ করলে এমনই হয়। জয় বাংলাকে আওয়ামী লীগ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। তারা এটাকে তাদের দলীয় স্লোগানে পরিণত করেছে। তারা একইভাবে বঙ্গবন্ধুকেও দলীয় বানিয়ে ফেলেছে, সার্বজনীন হতে দেয়নি,” বলেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন