আদালতের অনুমতি ছাড়াই সাজাপ্রাপ্ত এমপি হাজী সেলিম বিদেশে

শরীফ খিয়াম
2022.05.03
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
আদালতের অনুমতি ছাড়াই সাজাপ্রাপ্ত এমপি হাজী সেলিম বিদেশে ঢাকায় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় হাজী সেলিম (মাঝখানে)। ২ জানুয়ারি ২০১৪।
[এপি]

উচ্চ আদালত আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়ার পরও দশ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ক্ষুব্ধ সরকারি দলের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি।

বিষয়টি ঠিক হয়নি বলে বেনারকে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী ও বিশ্লেষকেরা।

বিএনপির প্রশ্ন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না পারলে হাজী সেলিম একই পরিস্থিতিতে গেলেন কীভাবে?

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, “দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম ব্যাংককে গেলেও সরকার দীর্ঘদিন ধরে শুধু রাজনৈতিক কারণে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দিচ্ছে না।”

দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে ফাতেহা পাঠ শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি আরো বলেন, হাজী সেলিমের বিদেশ ভ্রমণের ঘটনা প্রমাণ করে খালেদাকে রাজনৈতিক কারণে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

“দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির কখনো, কোনোভাবেই বিদেশ যাওয়ার সুযোগ নেই,” উল্লেখ করে মঙ্গলবার দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বেনারকে জানান, তাঁর দেশত্যাগের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। তিনি কীভাবে যেতে পারলেন সেটা তাঁদেরও প্রশ্ন।

“খালেদা জিয়াকে-তো সরকার অনুমতি দেয়নি। আমাদের সেখানে বক্তব্য ছিল– খালেদা জিয়া সরকারের কাছে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চাইতে পারবেন না। কারণ বিষয়টি বিচারাধীন। সেখানে হাজী সেলিমের বিষয়টি কিন্তু আরো গুরুতর,” বলেন তিনি।

“উনাকে ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি সেটা করবেন বা বিদেশ যাওয়া দরকার তা আদালতে বলতে পারতেন। তা না বলে, কিছুই না জানিয়ে গোপনে এভাবে চলে যাওয়া মোটেও আইনসিদ্ধ হয়নি,” যোগ করেন দুদক আইনজীবী।

দুদক কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেবে কিনা জানতে চাইলে খোরশেদ বলেন, “হাজী সেলিমের আইনজীবী বলেছেন, তিনি ঈদের পরে ‘সারেন্ডার’ করে আপিল বিভাগে নিয়মিত আপিল করবেন। তাঁরা যদি সেটা করেন, তবে তখন আমরা তাঁর এভাবে বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।”

সরকার জানে না

সরকারের পক্ষ হাজী সেলিমের বিদেশ যাওয়া সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। যোগাযোগ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বেনারকে বলেন, সরকার তাঁর বিদেশ সফরের বিষয়ে অবগত নয়।

“দিনতারিখ মনে করতে না পারলেও হাজী সেলিম আমার অফিসে এসেছিলেন এবং আমাকে জানান যে, তিনি আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইবেন। কিন্তু তিনি দেশ ছেড়েছেন কিনা, এটা জানা নেই,” জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বাংলাদেশে “ক্ষমতাসীনদের নিজের দলের বা পছন্দের” লোকদের জন্য একভাবে, অন্যদের জন্য অন্যভাবে আইন প্রয়োগ হচ্ছে বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

“এ জাতীয় ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে দেশে সুশাসন নেই, যা দুর্ভাগ্যজনক,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, “আইন সবার জন্য সমান, সবাইকে সমভাবে দেখা উচিত।”

তবে হাজী সেলিমের পালিয়ে যাবার “আজগুবি” খবর ছড়ানো হচ্ছে বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন তাঁর অন্যতম আইনজীবী এম সাঈদ আহমেদ রাজা।

তিনি বলেন, “উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি বিচারিক আদালতে এসেছে গত ২৫ এপ্রিল। ওই তারিখ থেকে একমাসের মধ্যে তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। তার আগে বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে আদালতের অনুমতি নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।”

আদালত হাজী সেলিমকে “এক মাসের একটা সুযোগ দিয়েই সারেন্ডার করতে বলেছেন,” জানিয়ে তিনি বলেন, “এই এক মাস শেষ হওয়ার আগে কোনো আদালত তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানাও জারি করতে পারবে না।”

“উনি আমার সাথে আলাপ করেই এই পদক্ষেপ নিয়েছেন,” উল্লেখ করে তিনি জানান, সেলিম শিগগির দেশে ফিরে আসবেন এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।

সেলিমের ছোট ছেলে ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইরফান সেলিম সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর বাবা চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড গেছেন। দেশে ফিরেই আইনজীবীদের সাথে কথা বলে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।

২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই মামলায় ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল তাঁকে দুই ধারায় ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয় বিচারিক আদালত।

২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবর রায়টির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন হাজী সেলিম। যার প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি তাঁর সাজা বাতিল করে আদালত। পরবর্তীতে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করে দুদক।

ওই আপিলের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায় বাতিল করে পুনরায় শুনানির নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ৯ মার্চ বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া রায়ে ১০ বছরের দণ্ড বহাল থাকলেও তিন বছরের দণ্ড থেকে খালাস পান তিনি।

বিচারিক আদালত যেদিন হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাবে, সেদিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে হাজী সেলিমকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে আত্মসমর্পণ না করলে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে বলা হয়েছে। আর যেসব সম্পত্তি নিয়ে এ সাজা দেওয়া হয়েছে তা বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিতে হবে।

আদালত খোলার পরে আপিল বিভাগে নিয়মিত আপিল করার পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সেলিমের জামিনের দরখাস্ত করা হবে বলেও বেনারকে নিশ্চিত করেছেন তাঁর আইনজীবী।

উল্লেখ্য, সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একজন সাংসদ নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত হলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। আর ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুযায়ী তাঁর সাজার রায় স্থগিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এমপি হিসেবে বিবেচিত হবেন না। তবে হাজী সেলিমের সংসদ সদস্য পদ এখনো বাতিল হয়নি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন