Follow us

এরশাদের মৃত্যু: ঐক্যের সংকটে পড়তে পারে প্রধান বিরোধী দল

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-07-15
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ফাইল ছবি। ২০ অক্টোবর ২০১৮।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ফাইল ছবি। ২০ অক্টোবর ২০১৮।
[বেনারনিউজ]

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতির একজন, সাবেক সামরিক শাসক ও বর্তমান জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর তাঁর দল জাতীয় পার্টিতে অসন্তোষের আশঙ্কা করছেন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। দলের একটি অংশ এরশাদের ভাই এবং অপর অংশ এরশাদের স্ত্রীর সঙ্গে রয়েছে।

নেতারা বলছেন, মৃত্যুর আগে এরশাদের মনোনীত দলীয় প্রধান ও ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের নেতৃত্ব দলের সবাই মানতে চান না।

দলের অপর অংশের নেতৃত্বে আছেন এরশাদের স্ত্রী ‍ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা বেগম রওশন এরশাদ।

রোববার এরশাদের মৃত্যুর পর তার আসন শূন্য ঘোষণার জন্য নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। বেনারকেএই তথ্য নিশ্চিত করেন সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া।

সোমবার প্রয়াত এই সাবেক রাষ্ট্রপতির কয়েক দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের জানাজায় অংশ নেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। তাঁকে মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় সম্মানে ঢাকা সেনানিবাস কবরস্থানে সমাহিত করার কথা বলা হয়েছে।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বেনারকে বলেন, “স্যারের মৃত্যুর পর এখন দল একত্রিত থাকবে কি না সেব্যাপারে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। কারণ, স্যারের ভাই জিএম কাদের যিনি এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তিনি দলের সবাইকে একত্রিত রাখতে পারবেন কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে।”

তিনি বলেন, “জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা। তারা বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্ব মানবে। কিন্তু কাদের সাহেবের নেতৃত্ব মানবেন বলে মনে হয় না।”

চুন্নু বলেন, “দলের প্রায় সকল এমপি চায় রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসুন। কারণ উনি দশম সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। এরপর প্রথম প্রশ্ন আসবে দলের চেয়ারম্যান কে হবেন। এবং পরবর্তী প্রশ্ন আসবে বিরোধীদলীয় উপনেতা কে হবেন।”

তিনি বলেন, “দলের অধিকাংশ প্রভাবশালী নেতারা রওশন এরশাদকে চাইবে। আবার জিএম কাদেরকে স্যার দলের উত্তরাধিকার করে গেছেন বলা যায়। এমন অবস্থায় কাদের সাহেব এবং রওশন এরশাদের মধ্যে সমঝোতা না হলে জাতীয় পাটি আরেক দফা ভাঙবে।”

তবে গোলাম মোহাম্মদ কাদের বেনারকে বলেন, “দলের প্রধান কে হবেন সেটি দলীয় ফোরামে আলোচনা করে নির্ধারণ করা হবে। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হবেন, কে বিরোধী দলীয় উপনেতা হবেন সেটি দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হবে। এগুলো এখন বলা সম্ভব নয়।”

তিনি বলেন, “দলের সকলে এরশাদ সাহেবের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল। আমি আশা রাখি আমরা দলের সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “প্রথম কথা হলো এরশাদ সাহেব যাকে দলের পরবর্তী চেয়ারম্যান মনোনীত করেছেন সেই জিএম কাদেরকে দলের সবাই মানছে না। এর আগে রওশন এরশাদ এবং ওই সকল নেতাদের চাপে দলীয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান এবং সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকে কাদেরকে অপসারণ করেন এরশাদ।”

তিনি বলেন, “তবে জিএম কাদেরকে ফেলেও দিতে পারবে না দলের নেতারা। কারণ তিনি এরশাদের আপন ছোট ভাই এবং জনগণের মধ্যে তাঁর ভাবমূর্তি ভালো।”

ড. নিজাম বলেন, “তবে পুরো বিষয়টির ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের একটি ভূমিকা থাকবে বলে আমার মনে হয়। কারণ, আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি বিএনপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মিত্র। জাতীয় পার্টির ভূমিকার কারণে সংসদে বিরোধীদলীয় রাজনীতি এখন উত্তেজনাপূর্ণ নয়।”

তিনি বলেন, “তাই, জাতীয় পার্টিতে কোন্দলের কারণে সংসদে তাদের কার্যক্রম ব্যাহত হবে সেটি সরকার চাইবে না।”

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির চেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে জয়ী হয় এরশাদের জাতীয় পার্টি। এরশাদের আসন শূন্য হওয়ার পর বর্তমানে সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির আসনসংখ্যা ২৫। আর বিএনপির সাত।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে লে. জেনারেল এইচ এম এরশাদ দ্বিতীয় সামরিক শাসক।

স্বাধীনতার পর মাত্র চার বছরের কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের স্থপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। দেশের বাইরে থাকায় শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর ওই বছর নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অভ্যুত্থান পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। প্রাণ হারান অনেক সামরিক কর্মকর্তা।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনা প্রধান মেজর জেনারেল ‍জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করেন। পরবর্তীতে বিতর্কিত হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে নিজেকে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান।

এরপর গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

১৯৭৯ সালে তাঁর দল জরুরি আইনের মধ্যে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। এরপর তিনি জরুরি আইন প্রত্যাহার করে বেসামরিকীকরণ করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে প্রাণ হারান জেনারেল ‍জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সকল দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ড. কামাল হোসেনকে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপি প্রার্থী বিচারপতি আব্দুস সাত্তার।

তবে ১৯৮২ সালের ২৪ এপ্রিল এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন সাত্তার। সামরিক শাসন জারি করেন তখনকার সেনাপ্রধান লে. জেনারেল এইচ এম এরশাদ।

প্রধান সামরিক শাসক হিসাবে ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁর শাসন বেসামরিকীকরণ করেন জেনারেল এরশাদ। বিএনপি সংসদ নির্বাচন বয়কট করে। জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে সরকার গঠন করে।

শেখ হাসিনা হন সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী।

১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্বাচিত হন এরশাদ। এরশাদ বিরোধী মনোভাব চাঙা হলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। ১৯৮৮ সালে আরেকটি একতরফা সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসে জাতীয় পার্টি।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন এরশাদ। কারাবন্দি হন এরশাদ।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে কারাবন্দী অবস্থায় পাঁচটি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হন এরশাদ। তাঁর দল সংসদে ৩৫ আসন লাভ করে।

তবে এরশাদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৪০টি দুর্নীতি মামলা দায়ের করে ১৯৯১ সালে ভোটে জয়ী বিএনপি সরকার। কয়েকটি মামলায় তাঁর সাজা হয়। বিএনপির পুরো মেয়াদে কারাবন্দী ছিলেন এরশাদ।

১৯৯৬ সালের জুন মাসে ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনেও তাঁর নিজ জেলা রংপুরের পাঁচটি আসনে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৭ সালে জামিনে মুক্তি পান এরশাদ।

২০০১ সালের অক্টোবর সাধারণ নির্বাচনে পুনরায় ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার।

২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে বাতিল হওয়া নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটে যোগদান করেন এরশাদ।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্য করে দল জাতীয় পার্টি।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সাধারণ নির্বাচন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বয়কট করলেও অংশগ্রহণ করে এরশাদের জাতীয় পার্টি। প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় পার্টি।

এরশাদ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হলেও বিরোধীদলীয় নেতা হন তাঁর স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ।

২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপিসহ সকল দল অংশগ্রহণ করে। ওই নির্বাচনে বিএনপিকে পিছে ফেলে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে জাতীয় পার্টি। আর এরশাদ হন বিরোধীদলীয় নেতা।

তবে নির্বাচনের একমাস আগে থেকেই তাঁকে দেখা যেত কম। সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন হুইল চেয়ারে বসে। এরপর প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বেনারকে বলেন, “জেনারেল এরশাদ ছিলেনে একজন সামরিক স্বৈরশাসক। অন্যান্য সামরিক শাসকদের মতো তিনিও দেশের সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছেন। আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে মানবধিকার রক্ষা করা যায় না।”

তিনি বলেন, “এরশাদ তার শাসনামলে দেশের হাজার হাজার মানুষের জীবন দুর্বিসহ করেছেন। অসংখ্য সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তি, ছাত্র-ছাত্রীকে হত্যা ও গুম করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখন পর্যন্ত কোনো গণতান্ত্রিক সরকার তাঁর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে কোনো তদন্ত করেনি।”

ড. মিজানুর রহমান বলেন, “রবং তিনি দেশের দুই বড় দলকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রেখে তাঁর সুবিধা আদায় করে গেছেন। গণ আন্দোলনের মুখে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু তিনি কিং মেকার হিসাবে প্রভাব খাটিয়ে গেছেন।”

এরশাদ মোট নয় বছর বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর শাসনামলেই বাংলাদেশে উপজেলা ও জেলা পরিষদ গঠিত হয়। তাঁর সময় তৎকালীন ৪২টি মহকুমাকে জেলায় পরিণত করার ফলে বাংলাদেশের জেলার সংখ্যা হয় ৬৪টি।

এরশাদ সাপ্তাহিক ছুটি রোববারের পরিবর্তে শুক্রবার ও বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেন।

এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই এর বিরোধীতা করেছিল। যদিও পরবর্তীতে কোনো দলই ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম পরিবর্তন করেনি।

এরশাদ ১৯৩০ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন