হেফাজতের আমির বাবুনগরীর মৃত্যু: ‘নেতৃত্ব সংকটে পড়তে পারে সংগঠন’

পুলক ঘটক
2021.08.19
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
হেফাজতের আমির বাবুনগরীর মৃত্যু: ‘নেতৃত্ব সংকটে পড়তে পারে সংগঠন’ ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় বৈঠকের পর গাড়িতে করে ফিরে যাচ্ছেন হেফাজতের প্রধান জুনায়েদ বাবুনগরী। ৬ জুলাই ২০২১।
[বেনারনিউজ]

অরাজনৈতিক সংগঠন হয়েও দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা বৃহত্তম ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর কারণে এই দলটিতে নেতৃত্ব সংকট প্রকট হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তাঁদের মতে, দলের প্রতিষ্ঠাতা আমির শাহ আহমদ শফী বছরখানেক আগে মারা যাওয়ার পর হেফাজত নিজেদের কোন্দল ও সরকারের চাপে এমনিতেই হাবুডুবু খাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আরও মনে করছেন, জুনায়েদ বাবুনগরী মারা যাওয়ার পর সরকারের ঘনিষ্ঠ হেফাজত নেতারা সংগঠনটিতে সাময়িকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। 

বৃহস্পতিবার দুপুরে জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর পর রাতে তাঁকে দাফন করার আগেই হেফাজতের ভারপ্রাপ্ত আমিরের নাম ঘোষণা করা হয়। হেফাজতের শুরা কমিটির সিদ্ধান্তে তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং হেফাজতের ১৬ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যদিও হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা নূরুল ইসলামের পুত্র মোরশেদ বিন নূর রাতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে বলেন, সংগঠনের শুরা কমিটির কোনো সভা হয়নি, ফোনে ফোনে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঠিক করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরে আলোচনা হবে। 

এর আগে দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে জুনায়েদ বাবুনগরীকে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

“কয়েক দিন ধরেই হুজুর অসুস্থ ছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিছানায় শোয়া অবস্থায় জ্ঞান হারান। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে হাটহাজারি থেকে চট্টগ্রাম সদরে নেওয়ার পথে ইন্তেকাল করেছেন। সিএসসিআর হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন,” বেনারকে বলেছেন বাবুনগরীর সহযোগী এইচ এম জুনাইদ। 

“স্ট্রোক হয়েছিল; হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তিনি মারা গেছেন। আমরা তাঁকে মৃত অবস্থায় পেয়েছি। কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের জটিল সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি,” বেনারকে বলেছেন সিএসসিআর হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এমজাদ হোসাইন। 

২০১০ সালে প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই হেফাজতে ইসলামের আমিরের দায়িত্বে থাকা আল্লামা শাহ আহমেদ শফী ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে মারা যাবার পর দলে নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। এর মাঝেই হেফাজতের বড়ো অংশের সমর্থনপুষ্ট আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী গত বছরের নভেম্বরে হেফাজতের আমির নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি ওই সংগঠনের মহাসচিব ছিলেন। 

নেতৃত্বের টানাপোড়েন

বাবুনগরী নেতৃত্বে আসার পর থেকেই এই ‘অরাজনৈতিক সংগঠনের’ বিভিন্ন কার্যক্রমে সরকারবিরোধিতা প্রবল হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন এবং ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুর্বণ জয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ব্যাপক তাণ্ডব চালায় হেফাজত কর্মীরা।

ওই ঘটনার পর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক অভিযানের মুখে গত ২৫ এপ্রিল হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। পরে গত ৭ জুলাই জুনাইদ বাবুনগরীকে আমির করে ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করে হেফাজত ইসলামী বাংলাদেশ। 

মওলানা শফীর পুত্র আনাস মাদানী এবং হেফাজতের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহিসহ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একটি অংশ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে ঠাঁই পাননি। মাওলানা শফী মারা যাওয়ার পর থেকেই চলমান টানাপোড়েনে সংগঠনটির বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সরব আছেন এই অংশটি। 

জুনাইদ বাবুনগরী আল্লামা শফী হত্যা মামলারও আসামি ছিলেন। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর সকালে আহমেদ শফীর শ্যালক মোহাম্মদ মাঈনুদ্দিন বাদী হয়ে চট্টগ্রামের একটি আদালতে বাবুনগরীসহ ৪৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এ ছাড়াও চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে সহিংস ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। এর আগে নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসিসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন এবং সংঘটিত সহিংস ঘটনায় মতিঝিল ও পল্টন থানায় দায়ের করা তিনটি মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন জুনায়েদ বাবুনগরী। 

২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চের বিরোধিতা, শাহবাগে আন্দোলনকারীদের নাস্তিক, মুরতাদ ঘোষণা দেয়া, ২০০৯ সালে সরকার ঘোষিত নারী উন্নয়ন নীতির বিরোধিতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতা করে ১৩ দফা দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে রাজনীতির প্রবল শক্তি হিসেবে মাঠে আবির্ভূত হয়েছিল এই অরাজনৈতিক সংগঠন। 

কোন পথে যাবে হেফাজত?

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদি বেনারকে বলেছেন, “আল্লামা বাবুনগরী একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ খাদেম এবং জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তাঁর শূন্যতা পুরণ হওয়ার নয়।”

তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে হেফাজতে ইসলামে নেতৃত্ব সংকট তৈরির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেছেন “নেতৃত্বের সংকট কেন হবে? এই সংগঠনে সবাই ইসলামের খেদমতে কাজ করেন। নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা এখানে বড়ো নয়। আমরা এখন এসব নিয়ে ভাবছি না। সংগঠন নিয়ম মাফিক চলবে।” 

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাবুনগরীর মৃত্যুর কারণে হেফাজতে ইসলামে নেতৃত্বের কোন্দল সৃষ্টির সম্ভাবনা প্রবল।

“হেফাজতে ইসলামে অনেক দল, মত যুক্ত। তাদের মধ্যে পারস্পরিক মতবিরোধ আছে। সুতরাং সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যেসব নেতারা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলছিলেন তাঁরা হয়ত প্রবল হবেন” বেনারকে বলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। 

তিনি বলেন, “হেফাজত সরকারের পক্ষেই ছিল। আবারও হয়ত সরকারের সঙ্গে থেকে তাদের নিজ উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাবে। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য উগ্র ইসলামি মৌলবাদ প্রতিষ্ঠা করা। তারা শরিয়াভিত্তিক ইসলামী শাসন চায়। সেখান থেকে তারা সরবে না।”

“তাদেরকে তো সবাই সমর্থন করে। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি–সবাই তাদের সমর্থন দিয়েছে; সবাই পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্য,” বলেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। 

প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বেনারকে বলেন, “আশা করব হেফাজত ইসলাম উগ্রপন্থী না হয়ে ইসলামের আধুনিক চিন্তাধারার ভিত্তিতে দেশের সেবায় কাজ করবে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত হবে।”

তিনি বলেন, “ইসলামকে বাজারের মাধ্যমে ব্যবসার পণ্যে পরিণত করা উচিত নয়। তারা ওয়াজের মাধ্যমে অনেক ভুল শিক্ষা দেয়, যা মানুষের জন্য এবং দেশের জন্যেও ক্ষতিকর। তারা ইসলামের মডার্ন কনসেপ্ট তুলে ধরুক, অগণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা নয়।” 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ মাহমুদের মতে এখন, “সংগঠনটির সরকারবিরোধী ক্যাম্প দুর্বল হবে এবং সরকার সমর্থকরা প্রবল হবে।”

তিনি বলেন, “ছোট ছোট মাদ্রাসগুলো এখন আল্লামা আহমেদ শফীর অনুসারীদের দিকে ঝুঁকবে। ফলে মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহি এবং আহমদ শফীর ছেলে মাওলানা আনাস মাদানীসহ তাদের দিকটা ভারী হবে। সরকারের আনুকূল্যও তারা পাবে।” 

ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, “সরকার মামুনুল হক এবং মওলানা গুনবীর মতো উগ্রপন্থী বক্তাদের নিষ্প্রভ করে দিয়েছে। এখন বাবুনগরীর মৃত্যুর পর হেফাজতের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠে বলার লোক কম থাকবে। তবে তাতে হেফাজতের সমর্থনের ভিত্তি দুর্বল হবে না এবং নীতির কোনো পরিবর্তন হবে না; কৌশলগত পরিবর্তন আসতে পারে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন