বিদেশে খালেদার চিকিৎসার দাবিতে বিএনপি’র বিক্ষোভ, নাটোর ও খুলনায় সংঘর্ষ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2021-11-22
Share
বিদেশে খালেদার চিকিৎসার দাবিতে বিএনপি’র বিক্ষোভ, নাটোর ও খুলনায় সংঘর্ষ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপির সমাবেশ। ২২ নভেম্বর ২০২১।
[বেনারনিউজ]

গুরুতর অসুস্থ সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে শনিবার গণ-অনশনের পর সোমবার দেশজুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।

পুলিশ ও বিএনপি নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, নাটোর ও খুলনায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে একজন সাংবাদিক, পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীসহ কমপক্ষে ৯০ জন আহত হয়েছেন। বিপুল সংখ্যক পুলিশ পাহারায় ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি শেষ হলেও সেখানে উত্তেজনা ছিল।

২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটিই প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বড়ো রাজনৈতিক কর্মসূচি বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

ঢাকার সমাবেশে কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর উদ্দেশ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আন্দোলনের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, “আমাদের সামনে এখন আর কোনো পথ খোলা নেই। আমাদের সামনে একটাই পথ: আন্দোলন, আন্দোলন আর আন্দোলন। এ আন্দোলনকে তীব্র করে সামনের দিকে আরও বেগবান করতে হবে।”

আগামী সংসদ নির্বাচন একটি দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত করার দাবির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিতে অন্যান্য বিরোধী দলকে আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল।

গত ১৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি আছেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে দুটি দুর্নীতি মামলায় তাঁর মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয়। এই দুটিসহ তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা চলমান।

কারাগারে অসুস্থ হলে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে সরকার। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ থেকে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন খালেদা জিয়া।

তবে শর্ত হিসাবে বলা হয়, তিনি দেশে অবস্থান করে দেশীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন। কোনো প্রকার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন না এবং শর্ত ভঙ্গ হলে তাঁকে পুনরায় কারাগারে প্রেরণ করা হবে।

১৪ এপ্রিল করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়লে ১৭ এপ্রিলে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। চিকিৎসক ও দলীয় নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তাঁর শারীরিক জটিলতা বেড়ে গেছে, এখন তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো দরকার।

তবে বিএনপির এই দাবি নাকচ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বেনারকে বলেন, একজন দণ্ডিত ব্যক্তির দেশত্যাগ আইন বিরোধী এবং বিএনপি বিদেশি চিকিৎসক এনে চিকিৎসা করাতে চাইলে সরকার সহায়তা করবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “খালেদা জিয়া এখন জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে। তাঁর উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। সরকার এই বিষয়টি বুঝতে চাইছে না। তাঁরা রাজনৈতিক কারণে খালেদা জিয়াকে বিদেশ যেতে দিচ্ছে না।”

খালেদা জিয়া উচ্চ ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, আর্থ্রাইটিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন বলে তাঁর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

নাটোর-খুলনায় সংঘর্ষ

নাটোর থেকে নির্বাচিত সাবেক সাংসদ ও উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সোমবার বেনারকে বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশ-প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছিল।

তিনি বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করছিলাম। হঠাৎ পুলিশ বিনা উস্কানিতে আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর আক্রমণ করে।”

নাটোরে পুলিশের সাথে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন বলে বেনারকে জানান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ তারেক জুবায়ের।

তিনি বলেন, নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং দৈনিক যুগান্তরের নাটোর প্রতিনিধি এ ঘটনায় আহত হয়েছেন।

সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আক্রমণ করার কারণে মামলা দায়ের করা হবে বলে জানান তিনি। তবে কীভাবে সংঘর্ষের সূত্রপাত সেব্যাপারে কিছু বলেননি।

খুলনা সদর আসনের সাবেক সাংসদ নজরুল ইসলাম মঞ্জু সোমবার বেনারকে বলেন, বিএনপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ ব্যাপক মারধর করেছে।

তিনি বলেন, “আমরা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের জন্য সরকারের অনুমতি চেয়েছিলাম, তারা দেয়নি। তবে আমরা কর্মসূচি পালন করেছি এবং আমাদের কর্মসূচিতে অনেক মানুষের সমাগম ঘটে।”

“হঠাৎ পুলিশের বেধড়ক মারধরের কারণে আমিসহ কমপক্ষে ৭০ জন আহত হয়েছি। পুলিশের এমন আচরণ দুঃখজনক,” বলেন মঞ্জু।

বিএনপির সমাবেশ করার অনুমতি ছিল না। সেকারণে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে তারা পুলিশের ওপর চড়াও হয় বলে বেনারকে জানান খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন।

তবে এই সংঘর্ষে কতজন আহত হয়েছেন সেব্যাপারে কিছু জানাননি তিনি।

বিদেশে চিকিৎসা বিতর্ক

খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ দিলে দেশের মানুষ এটিকে আওয়ামী লীগের উদারতা হিসাবে দেখত বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল।

এছাড়া তাঁর মতে খালেদা জিয়াকে বিদেশ যেতে দিলে “বিএনপি আন্দোলন করারই সুযোগ পেত না।”

তিনি বলেন, “বিএনপি একটি বিশাল দল। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন পরিচালনা করার ক্ষমতা এই দলের আছে বলে আমি মনে করি।”

“তবে তারা যদি আন্দোলন না করে, তবে ধরে নিতে হবে তারা নির্বাচনের জন্য শক্তি জমিয়ে রাখছে,” বলেন ড. আসিফ নজরুল।

তবে বেগম জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার জন্য বিএনপি’র দাবিকে রাজনৈতিক ‘উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ বলেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।

সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে বিদেশ পাঠানোর দাবি সরকারের মানার কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “অবশ্যই বেগম জিয়া যাতে সর্বোচ্চ চিকিৎসা তিনি পান সেটি নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।”

বেগম জিয়াকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিএনপির দাবি “তাঁর স্বাস্থ্যগত কারণে নয়, এই পুরো দাবিটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত,” বলেন হাছান মাহমুদ।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন