পরীমনিকে তিন দফা রিমান্ড: বিচারকের কাছে ব্যাখ্যা চায় উচ্চ আদালত

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2021-09-02
Share
পরীমনিকে তিন দফা রিমান্ড: বিচারকের কাছে ব্যাখ্যা চায় উচ্চ আদালত প্রায় মাস খানেক জেলে খেটে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পাবার পর ঢাকায় ফেরার পথে গাড়ির ছাদে মাথা বের করে সেলফি তুলছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। ১ সেপ্টেম্বর ২০২১।
[বেনারনিউজ]

মাদক মামলায় গ্রেপ্তার চিত্রনায়িকা পরীমনিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডের যৌক্তিকতা নিয়ে নিম্ন আদালতের দুই বিচারকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত। পাশাপাশি, রিমান্ড চাওয়ার কারণ ও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে নথিপত্রসহ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ। 

পরীমনিকে বারবার রিমান্ডে নেয়ার বৈধতা প্রশ্নে রুল জারির আবেদনের শুনানিতে বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেয় মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ। 

“পরীমনিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় রিমান্ড মঞ্জুরকারী ঢাকার সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটবৃন্দ কী উপাদানের ভিত্তিতে এটা মঞ্জুর করেছেন তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন উচ্চ আদালত। তাঁদের লিখিত ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে তাঁদের ডেকে পাঠানো হবে,” বেনারকে বলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান।

আগামী ১০ দিনের মধ্যে দুই বিচারককে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক কাজী গোলাম মোস্তফাকে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর “মামলার নথিসহ আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে,” বলেও জানান তিনি। 

এর আগে, গত রোববার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় চিত্রনায়িকা পরীমনিকে তিন দফায় সাত দিন রিমান্ডে নেওয়ার প্রেক্ষাপটে রুল চেয়ে এই বেঞ্চে একটি আবেদন করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

“আমরা আদালতে বলেছি, রিমান্ডের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও নির্দেশিকা রয়েছে। তারপরেও তা লঙ্ঘন করে তিন দফায় পরীমনিকে পুলিশি রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে,” বেনারকে জানান আসকের আইনজীবী জেড আই খান পান্না। 

পুলিশ মনে করলে তাঁকে জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারত জানিয়ে তিনি বলেন, “নিয়মানুসারে জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয়। জিজ্ঞাসাবাদকালীন অভিযুক্তের আইনজীবী ও আত্মীয়-স্বজনকে উপস্থিত থাকার অনুমতি দিতে হবে।”

“কিন্তু নিম্ন আদালতের সংশ্লিষ্টরা ও পুলিশ সুপ্রিমকোর্টের এই নির্দেশ পালন করেননি,” বলেন আইনজীবী জেড আই খান।

রিমান্ড ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম হাতিয়ার’

দেশে রিমান্ডের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অহরহ ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বেনারকে বলেন, “আমরা অতি সম্প্রতি লক্ষ করছি, কাউকে আটক করার সঙ্গে সঙ্গে রিমান্ড চাওয়াটা দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রীতিতে পরিণত হয়ে গেছে। তাঁরা ১২-১৫ দিনের রিমান্ড চাইবেন, আদালত অন্তত ৭ দিন মঞ্জুর করবেন-এটাই ধরাবাঁধা নিয়ম হয়ে গেছে।”

“জটিল কোনো মামলায় তাৎপর্যপূর্ণ বা প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য রিমান্ড প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু যেভাবে ঢালাওভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এতে করে এর গ্রহণযোগ্যতা, কার্যকারিতা সবকিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম হাতিয়ারও হয়ে গেছে রিমান্ড,” বলেন তিনি। 

এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের ভূমিকার প্রশংসা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, “এ রকম নির্দেশনাই উচ্চ আদালত থেকে আশা করে থাকি। তারা যদি কঠোর হন তাহলেই নিম্ন আদালতের বিচারকরা আরো বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন।” 

“সমাজে এবং রাষ্ট্রে যখন নানাবিধ উন্নয়ন সাধন হয় আইনাঙ্গন ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সেই উন্নয়ন ও সভ্যতার প্রতিফলন হওয়া দরকার,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আশা করি আজকের উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শিক্ষা গ্রহণ করবে।” 

গত ৪ আগস্ট বনানীতে অভিযান চালিয়ে পরীমনিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। আটকের সময় তাঁর বাসায় কয়েক বোতল মদ এবং কিছু নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য পাওয়া যায় বলে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরদিন এ বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বনানী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয় ।

পরবর্তীতে পরীমনিকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলে তাঁকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রথম দফায় চার দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করে। প্রথম দফা রিমান্ড শেষে আরেক দফা রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। তখন আরও দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। এরপর আরেক দফা রিমান্ড আবেদন করলে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

মঙ্গলবার বিচারিক আদালত থেকে জামিন পেয়ে বুধবার কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছেন পরীমনি। 

এর আগে গত জুন মাসে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে সাভার থানায় মামলা করে আলোচনায় আসেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। 

মামলার কয়েক ঘণ্টা পর প্রধান আসামি নাসির (৫০), অমিসহ (৪১) পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। নাসির বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। 

২০২০ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের করা এশিয়ার ১০০ ডিজিটাল তারকার তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছিলেন নায়িকা পরীমনি। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে তাঁর প্রায় এক কোটি ফলোয়ার রয়েছে।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন