বরগুনায় কয়লাভিত্তিক চীনা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মবিরতি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2021-09-28
Share
বরগুনায় কয়লাভিত্তিক চীনা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মবিরতি মজুরি বৃদ্ধি, খাবার, সুপেয় পানি এবং নামাজের জায়গার ব্যবস্থাসহ সাত দফা দাবিতে বরগুনা জেলার তালতলা উপজেলায় নির্মাণাধীন চীনা কয়লা প্রকল্পের কয়েক হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মবিরতি। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ।
[বেনারনিউজ]

মজুরি বৃদ্ধি, খাবার, সুপেয় পানি এবং নামাজের জায়গার ব্যবস্থাসহ সাত দফা দাবিতে মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি পালন করেছে বরগুনা জেলার তালতলা উপজেলায় নির্মাণাধীন চীনা কয়লা প্রকল্পের কয়েক হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক।

স্থানীয় শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও পুলিশের তথ্যমতে, বারবার জানানোর পরও সমস্যা সমাধান না করায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে চীনা ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সোমবার থেকে কর্মবিরতি শুরু করে ৩৫০ মেগাওয়াট বরিশাল ইলেকট্রিক-পাওয়ার চায়না বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিকেরা। 

শ্রমিক ও চীনা ব্যবস্থাপনার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী স্থানীয় তালতলা উপজেলা চেয়ারম্যান রিজভী উল কবির জমাদ্দার মঙ্গলবার বেনারকে জানান, তারা সমস্যা সমাধানের কাছাকাছি জায়গায় পৌঁছালেও মঙ্গলবার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়নি।

বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান আইসো টেক গ্রুপের আইসো টেক ইলেকট্রিফিকেশন কোম্পানি লিমিটেড ও চীনা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়নার সমন্বয়ে গঠিত বরিশাল ইলেকট্রিক চায়না পাওয়ার কোম্পানি এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে। ২০১৭ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া এই কেন্দ্রটির ২০২২ সালে উৎপাদনে যাওয়ার কথা। প্রকল্পে খরচ হবে ৪ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বা ৫৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সিংহভাগ অর্থ চীনা কোম্পানির হলেও এর সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামের বাঁশখালী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চীনা ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে কমপক্ষে সাতজন শ্রমিক নিহত হওয়ার পর এই প্রথম আরেকটি চীনা ব্যবস্থাপনার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলো। 

শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া

শ্রমিকদের সাত দফা দাবি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের নেতা জাফর হাওলাদার মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, “আমাদের একজন সাধারণ শ্রমিককে মাসে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে দিনে সাড়ে নয় ঘণ্টা থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করতে হয়।”

তিনি বলেন, “আমাদের দাবি, এই মজুরিতে আমরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করব এবং বাকি সময়ের জন্য আমাদের ওভার টাইম দিতে হবে।”

“এখানে কাজ করার সময় একটানা ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে থাকতে হয়। খাবার জন্য বাইরে যেতে পারে না কেউ। সে কারণে আমরা চাই, খাওয়ার জন্য মাসে সাড়ে চার হাজার টাকা দেয়া হোক,” যোগ করেন তিনি।

জাফর বলেন, “বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নামাজ পড়ার জায়গা নেই। শুক্রবারে দুই ঘণ্টা বিরতি দেয়া হয়। আমরা চাই আমাদের নামাজ পড়তে দেয়া হোক, নামাজের জায়গা দেয়া হোক।” 

তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। শুধু দুজন নার্স আছে। কোনো ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলেও সেলাই দেয়ার ব্যবস্থা নেই। বিশ্রামেরও ব্যবস্থা নেই।” 

“চীনা কর্মকর্তারা এই কেন্দ্রটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে। তারা টয়লেট তৈরি করেছে, যেগুলোর দরজা নেই। সবাইকে দরজা ছাড়া বাথরুম ব্যবহার করতে হয়, যা বিরক্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য। আমরা চাই আমাদের মতো দরজাওয়ালা টয়লেটের ব্যবস্থা করা হোক,” জানান ওই শ্রমিক নেতা।

তিনি আরও বলেন, “চীনা কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আমাদের দাবি মেনে নেয়নি। তারা বলেছে, খাওয়ার জন্য দিনে ১৫০ টাকার পরিবর্তে ৫০ টাকা দেবে এবং শুক্রবারে দুই ঘণ্টার পরিবর্তে তিন ঘণ্টা বিরতি দেবে।” 

জাফর বলেন, “কোম্পানি আমাদের বলছে, আমরা যেন আগে কাজে যোগ দিই। এরপর তারা বিবেচনা করবে। আজও শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়নি। আমরা এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, বুধবার কাজে যোগ দেবো কি না।” 

বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে রয়েছেন চীনা কর্মকর্তারা।

তালতলি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়ে এবং প্রকল্প সম্পর্কে জানতে আইসো টেক গ্রুপের সঙ্গে ই মেইলে যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। 

‘কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি’

তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত তালতলি থানার এসআই দেলোয়ার হোসেন মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে বর্তমানে ২৭৮ জন চীনা নাগরিক রয়েছে। তিনি বলেন, চীনারা মূলত বড়ো বড়ো কাজ করেন এবং বাংলাদেশিরা সাধারণ শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। 

দেলোয়ার হোসেন বলেন, শ্রমিকেরা তিন দিন আগে লিখিতভাবে তাঁদের দাবির ব্যাপারে চীনা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। তাঁরা কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় সোমবার থেকে কর্মবিরতিতে যান বাংলাদেশি শ্রমিকেরা। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় পুলিশের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও জানান দেলোয়ার হোসেন।

উপজেলা চেয়ারম্যান রিজভী উল কবির জমাদ্দার মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, “সমস্যা সমাধানে কয়েক দফা চীনাদের সাথে সভা করেছি। তারা কিছু দাবি মেনে নিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের দাবি অনেক বেশি। যদিও এসব দাবি অযৌক্তিক নয়। আশা করছি শিগগির সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।” 

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে চীনাদের প্রাধান্য রয়েছে। বেশির ভাগ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বাস্তবায়ন করছে চীনা কোম্পানি। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি বৃহৎ প্রকল্পে চীনা কোম্পানি অর্থায়ন করছে। 

সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বাংলাদেশে বর্তমানে ১৪৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সাড়ে ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ২১টি কয়লাভিত্তিক। 

পরিবেশগত কারণে এবং কাজের অগ্রগতি না থাকায় ১০টি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র সম্প্রতি বাতিল করে দেয় সরকার। তবে মাতারবাড়ি, রামপাল ও তালতলি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাতিল করা হয়নি। 

“সারা বিশ্ব অনেকদিন আগে থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বন্ধ করে দিচ্ছে। আর আমাদের দেশে নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে, যা দুঃখজনক,” বেনারকে বলেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি সদস্য-সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। 

তিনি বলেন, এগুলো আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং সময় থাকতে, ক্ষতি হওয়ার আগেই সব কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ করা হোক।

এদিকে বাংলাদেশে চীন আর কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করবে না বলে মঙ্গলবার চাইনিজ এন্টারপ্রাইজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশের সপ্তম কাউন্সিল সভায় জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং।

এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিংপিং সব দেশের ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন