অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.11.21
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি লোডশেডিং ও জনভোগান্তির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ‘হারিকেন মিছিল’ শিরোনামে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে ছাত্র ফেডারেশন নামের একটি সংগঠন। ২৫ জুলাই ২০২২।
[বেনারনিউজ]

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং এ কারণে সরকারের ভর্তুকি কমাতে সোমবার বাংলাদেশে বাড়ানো হয়েছে পাইকারি বিদ্যুতের দাম।

এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমান প্রতি ইউনিট পাঁচ টাকা ১৭ পয়সা থেকে শতকরা প্রায় ২০ ভাগ বৃদ্ধি করে ছয় টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করেছে, যা ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। সর্বশেষ পাইকারি দাম বৃদ্ধি হয়েছিল ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।

পাইকারি দাম বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় গ্রাহক ও উৎপাদক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে বলে বেনারকে জানিয়েছেন কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ বজলুর রহমান।

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় ব্যক্তি গ্রাহক থেকে শুরু করে শিল্প, কলকারখানাসহ সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

তাঁর মতে, এতে করে “ব্যক্তিগত খরচ বেড়ে যাবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে।”

“এটা স্পষ্ট যে, সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার জন্য বিদ্যুতের ভর্তুকি কমাতে দাম বৃদ্ধি করেছে। আইএমএফ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যে এ ঘোষণা এসেছে,” সোমবার বেনারকে বলেন আনু মুহাম্মদ।

বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে “অন্য কোনো উপায়ে জনগণকে এই বোঝা থেকে রক্ষা করা যেত, যা সরকার করেনি,” বলেন তিনি।

বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর কাছে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে সরকার। এই ঋণ আবেদন পর্যালোচনা করতে সম্প্রতি আইএমএফ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে এবং ঋণ দেয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ঘোষণা দেয়। তবে আইএমএফ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা এখনো জানায়নি।

আইএমএফ এর ঋণ প্রাপ্তির শর্ত হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভর্তুকি কমানোর কথা বলা হয়েছে বলে বাংলাদেশের প্রায় সব গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কিন্তু সরকার অথবা আইএমএফ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।

বেনারের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয় ও পাওয়ার সেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি আইএমএফের ঋণ প্রাপ্তির শর্ত কিনা, সে বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গ্রাহক পর্যায়েও দাম বাড়বে

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির দায়িত্ব এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এর জনসংযোগ পরিচালক শামীম হাসান সোমবার বেনারকে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে নেয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

পিডিবি সেই বিদ্যুৎ ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিসহ সাত কোম্পানির কাছে পাইকারি দরে বিক্রি করে। সোমবার সেই দর বৃদ্ধি করা হয়েছে।

এই সাত কোম্পানি ব্যক্তি গ্রাহক, শিল্প, কলকারখানাসহ বিভিন্ন উৎপাদনকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে খুচরা দরে বিক্রি করে।

“আমরা আজ পাইকারি বিদ্যুতের দাম শতকরা ২০ ভাগ বাড়িয়েছি,” জানিয়ে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের বিদ‌্যুৎ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য মোহাম্মদ বজলুর রহমান সোমবার বেনারকে বলেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণে “গ্রাহক পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে।”

তিনি জানান, এখন কোম্পানিগুলো এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির জন্য আবেদন করবে। কমিশন গণশুনানির মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে।

“তবে সেটি শতকরা কত ভাগ হবে সেব্যাপারে আগে থেকে কিছু বলা যাবে না,” বলেন তিনি।

ভালো সিদ্ধান্ত নয়

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সোমবার বেনারকে বলেন, “সরকার দাম বৃদ্ধি করছে দুটি দিক বিবেচনা করে। একটি হলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং আরেকটি হলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভর্তুকি কমানো।”

তবে তাঁর মতে, “অর্থনীতির এই অবস্থায় এটি কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়।”

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে সেব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো, আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামাল এলএনজি’র ওপর অত্যধিক নির্ভর করে ফেলেছি। আমরা আমাদের সমুদ্রসীমায় কোনো প্রকার তেল-গ্যাস উত্তোলন করিনি।

“অপচয়, চুরি ও দুর্নীতির কারণে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খরচ বেড়ে যায়। ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে যায়। দিন শেষে সেটি গ্রাহক ও উৎপাদক পর্যায়ে চলে যায়। এগুলো কমালে ভর্তুকির পরিমাণ অনেক কমে আসত,” বলেন মোস্তাফিজুর রহমান।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সমস্যা ও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যবসায়ীরা বর্তমান “চাপের মধ্যে” আছেন বলে সোমবার বেনারকে জানান ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন।

তিনি বলেন, রপ্তানি কমছে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ মিলছে না। বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে। আমাদের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি আমাদের জন্য অসহনীয় হয়ে যাবে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।