Follow us

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণ: সন্দেহভাজন ধর্ষক গ্রেপ্তার

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2020-01-08
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার মজনুকে কাওরান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে হাজির করে র‍্যাব। ৮ জানুয়ারি ২০২০।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার মজনুকে কাওরান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে হাজির করে র‍্যাব। ৮ জানুয়ারি ২০২০।
[বেনারনিউজ]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মজনু একজন ‘ক্রমিক ধর্ষক’। বনানী থেকে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় এর আগেও ধর্ষণের মতো অপরাধে তিনি যুক্ত ছিলেন। বুধবার মজনুকে গ্রেপ্তারের পর র‍্যাব এই তথ্য প্রকাশ করে।

“মজনু বলেছে নিয়মিতই সে ধর্ষণ করে থাকে, সে একজন সিরিয়াল রেপিস্ট,” কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারওয়ার বিন কাশেম।

তিনি আরও বলেন, প্রধানত প্রতিবন্ধী ও ভিক্ষুক নারীরা তাঁর প্রধান শিকার। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত কোনো নারীকে এই প্রথম তাঁর শিকারে পরিণত হতে হয়েছে বলেও মজনুকে উদ্ধৃত করে বলেছে র‍্যাব।

উল্লেখ্য, বুধবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শেওড়ার একটি পরিত্যক্ত রেলওয়ে বগি থেকে মজনুকে গ্রেপ্তার করা হয়। সকালেই ধর্ষণের শিকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অপরাধীকে শনাক্ত করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগমকে ছাত্রীটি বলেছিলেন, ধর্ষককে দেখলে তিনি চিনতে পারবেন।

সন্দেহভাজন ধর্ষকের চেহারার ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁর সামনের দুটি দাঁত ভাঙা। এর বাইরেও ছাত্রীটি ওই ব্যক্তির উচ্চতা, গায়ের রং, চুল, নোংরা পোশাক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের বলে ধারণা করেন এমনটি জানিয়েছিলেন।

ছাত্রীটিকে উদ্ধৃত করে সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, “তাঁকে যখন ছবিটি দেখাই, সঙ্গে সঙ্গেই তিনি শনাক্ত করেন। তিনি নিশ্চিত কি না জানতে চাইলে বলেন, জীবনে সব চেহারা ভুলে গেলেও, কখনো এই চেহারা ভুলতে পারব না।”

ছাত্রীটির এক আত্মীয় (বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুসারে নাম প্রকাশ করা হলো না) জানান, মেয়েটি ধর্ষককে শনাক্ত করেছে।

“সকালে ছবিটি তাকে দেখানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিই যে আসামি সে বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ,” ওই আত্মীয় বেনারনিউজকে বলেন।

র‍্যাব জানায় গত ৫ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর থেকেই বাহিনীর ১১টি ব্যাটালিয়ন মাঠে ছিল। এর আগে মঙ্গলবার মহাপুলিশ পরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, পুলিশের সব কটি ইউনিট আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে। এটিই তাঁদের অগ্রাধিকারের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে।

কে এই মজনু?

র‍্যাব জানায়, মজনু একজন ভবঘুরে। মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ দোকানীর কাজ করতেন। চুরি-ছিনতাই, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে তিনি যুক্ত ছিলেন। বনানী রেলওয়ে স্টেশন থেকে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকা পর্যন্ত তাঁর বিচরণ। বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়ায়। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। স্ত্রী মারা গেছেন।

“মজনু তার অপরাধের কথা অকপটে স্বীকার করেছে। তার মধ্যে কোনো বিকার দেখিনি আমরা,” সারওয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের বলেন।

সেদিনকার ঘটনা সম্পর্কে র‍্যাবকে মজনু বলেছেন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকে তিনি সেদিন সন্ধ্যার দিকে বের হচ্ছিলেন। এ সময় বিমানবন্দরের রাস্তা ধরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে হাঁটতে দেখে পেছন থেকে জাপটে ধরেন। ধর্ষণের পর ছাত্রীটির ব্যাগ, মুঠোফোন, পাওয়ার ব্যাংক ও অন্যান্য জিনিস ছিনিয়ে নেন।

রোববার রাতেই মজনু তাঁর পূর্ব পরিচিত অরুণার কাছে কুর্মিটোলায় পাঁচশ টাকায় মুঠোফোনটি বিক্রি করে দেন। তারপর নরসিংদী চলে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে মঙ্গলবার দিনভর বনানী স্টেশনে ছিলেন। অরুণাই শেষ পর্যন্ত মজনুকে শনাক্ত করতে সহযোগিতা করেন।

যেভাবে গ্রেপ্তার

মজনুর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর ব্যবহৃত স্যামসাং মুঠোফোন ছিল। তিনি মুঠোফোনটি অরুণাকে বিক্রি করে দেন। অরুণা স্ক্রিন ঠিক করাতে দেন খায়রুল নামের একজনকে।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে র‍্যাব প্রথমে অরুণাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়ে আসে। অরুণার দেওয়া তথ্য অনুসারে খায়রুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুজনের কাছ থেকেই র‍্যাব মজনুর একটা বিবরণ পায়।

“অরুণা পাঁচশ টাকায় মুঠোফোনটি কিনেছিলেন, একশটাকা বাকি ছিল। আমরা অরুণাকে কাজে লাগাই। বাকি টাকা নিতে অরুণা মজনুকে আসতে বলেন,” সারওয়ার বিন কাশেম বলেন। শেওড়া রেলস্টেশনে মজনু আসেন। তখনই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার দিনভর তিনি বনানী স্টেশনে ছিলেন।

তদন্ত ডিবির হাতে

মজনুকে সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়। ডিবি উপকমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, পরবর্তী তদন্তের কাজটুকু তাঁরা এগিয়ে নেবেন।

“আসামি হস্তান্তর করা হয়েছে। আমরা ধর্ষণ প্রমাণে যে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, সবটাই করব। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার আছে। আমরা এর ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দেবো,” মশিউর রহমান বেনারনিউজকে বলেন।

এ দিকে ধর্ষণের শিকার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে বাংলাদেশ আইন সমিতি সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন মামলাটি অনুসরণ করবে।

“এই মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নজরদারি থাকবে,” কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেন।

ধর্ষকের ফাঁসি দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের

‘আমাদের সন্তানতুল্য ছাত্রীকে ধর্ষণের প্রতিবাদ ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে’ শীর্ষক মানববন্ধন থেকে বুধবার ধর্ষকের ফাঁসি দাবি করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি আয়োজিত ওই মানববন্ধনে এ কথা বলেন এ এস এম মাকসুদ কামাল।

“যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সংস্কারের কাজ করে, সেই প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী যখন এয়ারপোর্টের কাছাকাছি একটি জায়গায় ধর্ষণের শিকার হয় তখন সমগ্র জাতির কাছে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, এই দেশ কি ধর্ষকদের জন্য নিরাপদ হয়ে গেছে?” প্রশ্ন রাখেন মাকসুদ কামাল।

শিক্ষক সমিতি তাঁদের দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলে, রাজাকার ও ধর্ষকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মানবতা বিরোধী অপরাধের সাজা মৃত্যুদণ্ড হলে, ধর্ষণের সাজাও মৃত্যুদণ্ড হতে হবে।

এদিকে গতকালও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ধর্ষণের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করেছে। আজও এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

অভিযান চলবে

বুধবারই র‍্যাব বনানী রেলওয়ে স্টেশন থেকে ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন র‍্যাব-১ এর অধিনায়ক শাফি বুলবুল।

“পরিত্যক্ত ওয়াগন ও ফাঁকা জায়গাগুলোয় মাদকসেবী ও অপরাধীদের আনাগোনা আছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে,” শাফি বুলবুল বেনারনিউজকে বলেন।

জানা গেছে, বুধবার বেলা ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েছে র‍্যাব।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন