বাংলাদেশ সফরকালে জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধানের কঠোর ভূমিকা প্রত্যাশা

আহম্মদ ফয়েজ
2022.08.10
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
বাংলাদেশ সফরকালে জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধানের কঠোর ভূমিকা প্রত্যাশা ঢাকার ফার্মগেট এলাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পেটাচ্ছে পুলিশ। ৬ জুন ২০১৪।
[বেনারনিউজ]

বাংলাদেশ সফরকালে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং গুমের মতো গুরুতর অপরাধ অবিলম্বে বন্ধ করতে প্রকাশ্যে আহবান জানানোর জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের প্রতি দাবি জানিয়েছে নয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন।

আগামী ১৪ আগস্ট জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট বাংলাদেশে আসছেন, থাকবেন ১৮ আগস্ট পর্যন্ত। এ উপলক্ষে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বুধবার এক বিবৃতিতে এই আহবান জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয় ব্যাচেলেট প্রথম বাংলাদেশ সফরে সরকারি কর্মকর্তা ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করবেন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করবেন।

তবে ব্যাচেলেট বাংলাদেশে সফরকালে কখন কোথায় যাবেন এবং কী ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তা এখনো “চূড়ান্ত হয়নি” বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানান জাতিসংঘের ঢাকা অফিসের এক কর্মকর্তা।

“যদি কমিশনার স্পষ্টভাবে এই অধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা করতে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার দাবি করতে ব্যর্থ হন, তাহলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাঁর নীরবতাকে ব্যবহার করে অধিকার হরণ চলমান রাখবে এবং মানবাধিকার কর্মীদের অবজ্ঞা করবে,” বিবৃতিতে জানায় মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং জোরপূর্বক গুমের ঘটনা চালিয়ে যাচ্ছে।

অধিকার নামে স্থানীয় সংগঠনের তথ্যের বরাত দিয়ে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত বছর জানিয়েছে, ২০০৯ সালে সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে প্রায় ৬০০ জন নিখোঁজ হয়েছেন।

কিছু ভুক্তভোগীকে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস গোপনে আটকে রাখার পর মুক্তি দেওয়া হয়েছে বা আদালতে হাজির করা হয়েছে, বাকিরা নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিরা বন্দুকযুদ্ধের সময় মারা গেছেন বলে মিথ্যা দাবি করা হয়।

 বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি এখনও নিখোঁজ এবং নিহতদের অনেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচক ছিলেন, বলা হয় ওই বিবৃতিতে।

এতে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে জোরপূর্বক গুমের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার ক্রমাগত অস্বীকার করে আসছে।

অভিযুক্তরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন’

গত ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদসহ র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এবং এর বর্তমান ও সাবেক সাতজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর সরকার গুমের ভুক্তভোগীদের স্বজন, মানবাধিকারকর্মী এবং তাঁদের পরিবার এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে।

“কমিশনার ব্যাচেলেটের উচিত বাংলাদেশ সরকারকে গুম, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং হেফাজতে মৃত্যুর সমস্ত অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে উৎসাহিত করা,” বলা হয় বিবৃতিতে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাঁর স্পষ্ট করে জানানো উচিৎ যে, নিরাপত্তা বাহিনী যদি অব্যাহতভাবে এই নিপীড়ন চালিয়ে যায় তাহলে তা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশি সেনাদের মোতায়েনকে হুমকিতে ফেলবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং তার আগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিক এবং সরকারের সমালোচকদের দমন ও নিবৃত করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, এসব আইনের অধীনে দায়ের করা অনেক মামলা বছরের পর বছর ধরে চলমান থাকায় অভিযুক্তরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষার আহবান

বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অধিকার রক্ষার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে আহবান জানাতে অনুরোধ করেছে ব্যাচেলেটকে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর অবস্থাকে নাজুক দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া এবং জীবিকা, চলাচল এবং শিক্ষার ওপর ক্রমবর্ধমান নিষেধাজ্ঞা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ভীষণরকম সমস্যা।

প্রায় ৩০ হাজার শরণার্থীকে প্রত্যন্ত দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে যেখানে শরণার্থীরা খাদ্য ঘাটতি ও নিজেদের বন্দি হিসেবে মনে করেন বলে জানিয়েছেন, বলা হয় বিবৃতিতে।

এতে বলা হয়, “ব্যাচেলেট যখন রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করবেন, তখন তাঁকে নিশ্চিত করা উচিত যে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের তদারকি ছাড়াই শরণার্থীরা যেন তাঁর সাথে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিবৃতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বেনারকে বলেন, “আমাদের সরকার মানবাধিকার বিষয়ে কতটা সচেতন তা এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার মধ্য দিয়েই বুঝতে পারা যায়।”

তবুও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যাগুলো নিরসনে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করে জানিয়ে তিনি বলেন, “নিশ্চয় আমাদের পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে ধারণা পেলে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার সন্তুষ্ট হবেন।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ ও আহবানের সাথে একমত পোষণ করে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনারকে অবশ্যই অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোতে প্রকাশ্য অবস্থান নিতে হবে। গুমের বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক স্বাধীন তদন্ত কমিটি উঠনের উদ্যোগ তাঁর নেয়া উচিত।”

রোহিঙ্গাদের অধিকাররের বিষয়টি ব্যাচেলেটের সফরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা যেন যথাযথ মর্যাদা নিয়ে নিজ দেশে ফেরত যেতে পারেন তার সক্রিয় উদ্যোগ জাতিসংঘকে নিতে হবে।”

বিবৃতি প্রদানকারী অন্যান্য সংগঠনগুলো হচ্ছে; অ্যান্টি-ডেথ পেনাল্টি এশিয়া নেটওয়ার্ক (এডিপিএএন), এশিয়ান ফেডারেশন এগেনস্ট ইনভলান্টারি ডিজএপিয়ারেন্স, এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট জাস্টিস প্রজেক্ট, ইলিওস জাস্টিস-মোনাশ ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট ইনফোর্সড ডিসএপিয়ারেন্স, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস এবং রবার্ট এফ. আর কেনেডি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।