তৈরি পোশাক শিল্প: নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা অ্যাকর্ডের মেয়াদ বাড়ছে দুই বছর

আহম্মদ ফয়েজ
ঢাকা
2021-08-25
Share
তৈরি পোশাক শিল্প: নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা অ্যাকর্ডের মেয়াদ বাড়ছে দুই বছর
ঢাকার অদূরে সাভারে অবস্থিত একটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকরা। ৯ আগস্ট ২০২১।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানার নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে কাজ করা ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড বাংলাদেশের মেয়াদ আরো দুই বছরের জন্য বেড়েছে। সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী আগামী মঙ্গলবার মেয়াদ শেষ হবার আগেই নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ড ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সহস্রাধিক শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশের ক্রেতা, মানবাধিকার কর্মী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপের মুখে বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ উন্নয়নে ইউরোপীয় ক্রেতারা গড়ে তোলেন অ্যাকর্ড। 

শ্রমিকদের কাছে বেশ প্রশংসিত হওয়া অ্যাকর্ড ২০২০ সালের ১ জুন শ্রমিক ইউনিয়ন-ব্র্যান্ড-শিল্প সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত আরএমজি সাস্টেইনেবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) নামে একটি নতুন সংস্থার কাছে কার্যক্রম হস্তান্তর করে। 

তবে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো আরএসসি নিয়ে কখনোই সন্তুষ্ট ছিল না। বিশেষ করে মালিকদের প্রতিনিধিত্ব থাকা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ না থাকায় আরএসসিকে কার্যকর উদ্যোগ মনে করে না শ্রমিক সংগঠনগুলো। 

অপরদিকে শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় ইউরোপীয় ব্রান্ডগুলোকে বাধ্য রাখতে নেদারল্যান্ডস থেকেই ব্যান্ডগুলোর ওপর আইনি চাপ বহাল রাখতে কাজ করে যাচ্ছে অ্যাকর্ড। গত মে মাসে করা এ সংক্রান্ত তিন মাসের চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে মঙ্গলবার। শ্রমিকদের চাওয়া যে কোনো অবস্থায় কার্যক্রম চালিয়ে যাক অ্যাকর্ড। 

বুধবার অ্যাকর্ডের মেয়াদ আরো দুই বছরের জন্য বর্ধিত হলে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান বাংলাদেশ গার্মেন্টস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশন (বিজিআইডাব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।

“এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এর ফলে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো আরো উদ্যোগী হবে,” বেনারকে বলেন তিনি।

তবে মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এই উদ্যোগের ভালো বা মন্দ কোনটাই আছে বলে মনে করে না।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বেনারকে বলেন, “অ্যাকর্ডের এই নতুন চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো প্রভাব তৈরি করবে না।”

“এই চুক্তির ফলে তারা [অ্যাকর্ড] হয়তো আরএসসির ওপর কিছুটা তদারকি করার সুযোগ পাবে, এর বাইরে কিছু না,” বলেন আজিম। 

photo 2.jpg
ঢাকার অদূরে সাভারে অবস্থিত একটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকরা। ২২ নভেম্বর ২০১৯। [সাবরিনা ইয়াসমীন/বেনারনিউজ]

আরএসসি নিয়ে সন্তুষ্ট নয় শ্রমিকেরা

“আরএসসি শ্রমিকবান্ধব কোনো সংগঠন নয়। এটা কখনো অ্যাকর্ডের বিকল্প হতে পারে না। আমি সকল আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অনুরোধ করব তারা যেন অ্যাকর্ডের সঙ্গে থাকে। অন্যথায় স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনগুলো আরএসসি থেকে তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রত্যাহার করে নেবে,” বলেন বাবুল।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বেনারকে বলেন, “আমরা কোনোভাবেই মনে করি না যে অ্যাকর্ডের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। অ্যাকর্ডকে সরাসরি বাংলাদেশে বসে কাজ করতে দেয়া প্রয়োজন।” 

আমিরুল, যিনি আরএসসিরও সহ-সভাপতি, বলেন বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোকে বাধ্য করার ক্ষেত্রে আরএসসির আইনি ক্ষমতা নেই।

“শ্রমিক সংগঠনগুলো ও গার্মেন্টস শ্রমিকরা আরএসসি নিয়ে মোটেও খুশি নয়। কারণ এটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না,” বলেন আমিরুল।

তবে বিজিএমইএ মনে করে অ্যাকর্ডের তুলনায় ভালো কাজ করছে আরএসসি। 

আরএসসি বিষয়ে শ্রমিকদের মনোভাব ও অ্যাকর্ডের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাদের অবস্থান সম্পর্কে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বেনারের সঙ্গে কথা বলেন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান। 

তিনি বলেন, “এই দাবিগুলোর সঙ্গে আমরা মোটেও একমত নই। অ্যাকর্ডের কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ অ্যাকর্ডের টিমই আরএসসিতে কাজ করছে।”

তবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে আরএসসির কর্মকাণ্ড কিছুটা ধীরে চলছে বলে জানান তিনি। 

ঢাকার ড্রেস এন্ড ডিসমেটিক (প্রা.) লিমিটেডের শ্রমিক সালমা আক্তার মিমি বেনারকে বলেন, “অ্যাকর্ড আমাদের শক্তিশালী করেছে এবং আমাদের নিরাপত্তা বাড়াতে অনেক কাজ করেছে। আরএসসি শ্রমিকদের আপন মনে করে না, তারা মালিকদেরকেই আপন মনে করে।” 

“অ্যাকর্ডের চুক্তি দুই বছরের জন্য বেড়েছে জানতে পেরে আমি অনেক খুশি। আমি আশা করব আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আমাদের কারখানার মান উন্নয়নের বিষয়ে আন্তরিক থাকবেন।” 

“কয়েকদিন আগে আমাদের কারখানায় আরএসসির একটি প্রতিনিধি দল এসেছিল। তারা কোনো শ্রমিককে ডাকেনি। আমি কারখানার সেফটি কমিটির প্রধান হিসেবে গিয়েছিলাম,” বলেন সালমা। 

নারায়ণগঞ্জের অবন্তি কলার টেক্সট লিমিটেডের শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, “আরএসসি মালিকদের জন্য কাজ করে। আমাদের জন্য অ্যাকর্ড খুবই দরকার।” 

“অ্যাকর্ড দেশের বাইরে বসে কাজ করলেও আমরা কিছু আশা দেখতে পাই,” বলেন রফিক। 

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আরএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন বেনারকে বলেন, “আমরা একটি স্বাধীন স্থানীয় উদ্যোগ।” এর বাইরে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইকবাল।

আরএসসি নিয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষ সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব মোঃ এহছানে এলাহী বেনারকে বলেন, “সরকার শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের অভিযোগগুলো গুরুত্বসহ বিবেচনা করবে। সরকার শ্রমিক ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা সম্পর্কে সর্বোচ্চ আন্তরিক।” 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন কারখানায় ১৭টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কমপক্ষে ১৮জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। আর গত জুলাই মাসে হাশেম ফুড ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগার ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫১ শ্রমিকের।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন