Follow us

কার্যকর হলো নতুন সড়ক পরিবহন আইন

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-11-01
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
একজন মোটর সাইকেল আরোহীর সাথে কথা বলছেন ট্রাফিক পুলিশ। ঢাকা নভেম্বর ০১, ২০১৯।
একজন মোটর সাইকেল আরোহীর সাথে কথা বলছেন ট্রাফিক পুলিশ। ঢাকা নভেম্বর ০১, ২০১৯।
ছবি: বেনার নিউজ।

জাতীয় সংসদে পাশ হওয়ার দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় পর শুক্রবার থেকে বাংলাদেশে কার্যকর হয়েছে অধিকতর শাস্তির বিধান সংবলিত সড়ক পরিবহন আইন। গত বছর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ফসল এই আইন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক মাহবুব-ই-রাব্বানী বেনারকে বলেন, “আজ থেকে আইনটি কার্যকর করা হয়েছে।”

ফলে এখন থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য দায়ী চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল অথবা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ড হতে পারে। দুর্ঘটনা সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের জন্য বিদ্যমান সাজার পরিমাণ ও শাস্তির মাত্রা কয়েকগুণ বেড়েছে।

গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর আইনটি পাশ হওয়ার পর এটি কার্যকর করার বিরোধিতা করে আসছিল পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা। যে কারণে গত এক বছর আইনটি কার্যকর করার তারিখ নির্ধারণ করেনি সরকার।

আইনটির কঠোর বিধানগুলো সংশোধনের দাবিতে এ বছর ২৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীর সাথে সভা করেন পরিবহন শ্রমিক নেতৃবৃন্দ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান তাদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত ২৩ অক্টোবর গেজেটের মাধ্যমে আইনটি ১ নভেম্বর কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

তবে আইনটি প্রত্যাখান করেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা। সড়ক পরিবহন নেতা ও সরকার দলীয় সাংসদ শাজাহান খান বেনারকে বলেছেন, “শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ করে সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করা যাবে না।”

আইন হলেও বিধিমালা হয়নি

আইনটি কার্যকর হলেও এটি বাস্তবায়নের জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়নি।

সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান বেনারকে বলেন, বিধিমালা ছাড়া আইন প্রয়োগ করা হলে এর অপপ্রয়োগ হবে। তাই আইনটি বাস্তবায়নের আগে মালিক-শ্রমিকসহ সকল অংশীজনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি বিধিমালা প্রণয়ন করা হোক।

শাজাহান খান আরও বলেন, “আমরাও নিরাপদ সড়ক চাই। সড়কে মৃত্যু বন্ধ হোক, তা চাই। কিন্তু সবার একটি ধারণা যে, সড়কে প্রাণহানির জন্য একমাত্র চালকই দায়ী। এটা পুরোপুরি ঠিক না।”

“শুধুমাত্র চালকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে না। রাস্তার কারণে দুর্ঘটনা হয়, সড়কে ভুল ডিজাইনের কারণেও হয়। যানবাহনের যান্ত্রিক ক্রটির কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে।”

তাঁর মতে, “এভাবে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করে, ভয় দেখিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না।”

শাজাহান খান বলেন, “ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে না দিলে গাড়ি চালানোর মতো চালকই পাওয়া যাবে না। তাই, বিআরটিএ’র উচিত যারা গাড়ি চালাতে পারেন, কিন্তু ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই তাদের একটি পরীক্ষার মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া।”

এ বিষয়ে বিআরটিএ’র পরিচালক মাহবুব-ই-রাব্বানী বেনারকে বলেন, “আইনটি কার্যকর করতে বিধিমালা করা হয়নি। তবে আইন অনুযায়ী, যতদিন বিধিমালা না হবে, ততদিন ১৯৮৪ সালের মোটরযান বিধি এবং ১৯৪০ সালের বিধিমালা দিয়ে আইনটি প্রয়োগ করা হবে।”

বিআরটিএ’র পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) লোকমান হোসেন মোল্লা বেনারকে বলেন, বর্তমানে মোটর সাইকেল বাদে সারাদেশে ৪২ লাখ বিভিন্ন মোটরযান রয়েছে।

“তবে ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে ৩২ লাখ চালকের। এর মধ্যে পেশাদার চালকের সংখ্যা ১৯ লাখের মতো,” বলেন তিনি।

বিআরটিএ’র সাবেক পরিচালক হুমায়ূন রশীদ খলিফা বেনারকে বলেন, “নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হলে সড়কে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরবে।”

“কিন্তু আইনটির ওপর বিধি প্রস্তুত না হওয়ায় কিছুটা সমস্যা দেখা দেবে, যদিও বিআরটিএ বলছে নতুন আইনের বিধি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ১৯৮৪ সালের মোটরযান বিধিমালা ও ১৯৪০ সালের আইনের ওপর বিদ্যমান রুল বহাল থাকবে,” যোগ করেন তিনি।

উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, “নতুন আইন অনুযায়ী লাইসেন্সবিহীন একজন চালক গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা অথবা ছয়মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।”

হুমায়ূন রশীদ বলেন, “কিন্তু এমন যদি হয় যে একজন চালক ভুল করে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বাসায় অথবা অন্য কোথাও রেখে এসেছেন। সেক্ষেত্রে তাকে ছয় মাসের জেল দেওয়া কি ঠিক হবে?”

তিনি বলেন, “এসব খুঁটিনাটি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিস্তারিত বলা থাকবে বিধিমালায়। বিধিমালার অভাবে লাইসেন্স না থাকার বিধানসহ অন্যান্য বিষয়গুলোর অপব্যবহার হতে পারে।”

সাবেক এই কর্মকর্তা জানান, “দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলে চলবে না। আমাদের দেশে সড়কে যত প্রাণহানি হয় তার একটি বড় অংশ হলো পথচারী।”

তিনি বলেন, “সুতরাং, পথচারীদের পথচলা সম্পর্কে জানাতে হবে। যারা বেপরোয়া চালক, তাদের শাস্তি দিতে হবে। আবার চালককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন হয়।”

আইনে যা আছে

নতুন আইন অনুযায়ী, কোন চালক কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে সড়ক দুর্ঘটনার মাধ্যমে প্রাণহানি ঘটালে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ২৫ হাজার টাকা অথবা ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে একজন চালক।

হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালালে, উল্টোপথে যান চালালে, ফুটপাতে যানবাহন চালালে, চালকের সহকারি দিয়ে গাড়ি চালালে তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

গাড়ি চালনার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে, প্রতিবন্ধী ও মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ না করলে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা অথবা একমাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

কেন এই আইন?

গত বছর ২৯ জুলাই বেপরোয়া দুই বাসের প্রতিযোগিতায় ঢাকায় শহীদ রমিজউদ্দিন স্কুল ও কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। প্রথমে তাদের সহপাঠীরা সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায়। পরদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শুরু হওয়া ওই আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে সরকারিসহ বিভিন্ন গাড়ির নিবন্ধন ও চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করে। বাদ যায়নি পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িও।

শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দেন হাজার হাজার অভিভাবক ও সুশীল সমাজের সদস্যরা। দাবি ওঠে কঠোর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের। আন্দোলনকারীরা ঢাকাকে সারাদেশ থেকে সাতদিন বিচ্ছিন্ন করে রাখে।

তাদের দাবি ছিল, আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে চালক ও মালিকের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখতে হবে। সরকারও আন্দোলনকারীদের দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে। তবে আন্দোলন দমাতে শক্তি ব্যবহার করতে হয় সরকারকে।

জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদে পাশ করা হয় সড়ক পরিবহন আইন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন