Follow us

এবার মিয়ানমার থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আসছে বাংলাদেশে

কামরান রেজা চৌধুরী, শরীফ খিয়াম ও জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-02-06
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার বিশেষ দূত ও হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি সাক্ষাৎ করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার বিশেষ দূত ও হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি সাক্ষাৎ করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
এএফপি

আবারও সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মিয়ানমারের নাগরিক। তবে আর কাউকে আশ্রয় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট সীমান্তটি  সিল করার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ।

গত তিন দিনে বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম সীমান্ত পথ পেরিয়ে ৩৫টি পরিবারের ১৬০ জন মিয়ানমারের নাগরিক রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নের ৭২ নম্বর সীমান্ত পিলার এলাকার চেইক্ষ্যংপাড়ায় আশ্রয় নিয়েছে বলে বেনারকে জানান ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিরা বম।

রাখাইন বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো অভিযানের ভয়ে তারা পালিয়ে এসেছেন বলে জানান তিনি।

বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের জানান, আর কোনো মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দেবে না বাংলাদেশ।

বুধবার বিকেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “মূলত রাখাইন আর্মি (আরাকান আর্মি) ও মিয়ানমার আর্মির মধ্যে সংঘর্ষের কারণে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও বিভিন্ন এথনিক গ্রুপ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য আসছে।”

তবে বাংলাদেশ আর কোনো মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দেবে না জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বর্ডার সিল করে দিয়েছি।”

বৈশ্বিক অনুরোধে আবারও বর্ডার উন্মুক্ত করা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মোমেন বলেন, “আমরা বর্ডার অনেক খুলে রেখেছি। আর খুলব না। এবার অন্যরা খুলুক।”

আবারও বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ লুইন ও’কে জরুরি তলব করে প্রতিবাদও জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অনু বিভাগের মহাপরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠক করেন। এ সময় রাষ্ট্রদূতের হাতে একটি ‘নোট ভারবাল’ ধরিয়ে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বেনারকে বলেন, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে বলা হয়, গত দেড় বছরে বাংলাদেশের শত চেষ্টা সত্ত্বেও একজন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়নি। অথচ নতুন করে পরিকল্পিতভাবে রাখাইন অস্থিতিশীল করে দলে দলে বৌদ্ধ এবং অন্যান্য উপজাতিদের বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

খাবার পাচ্ছে না আশ্রিতরা

জিরা বম বেনারকে জানান, মিয়ানমার থেকে আসা পরিবারগুলো চেইক্ষ্যংপাড়ার বম সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছে।  পাহাড়বাসীদের প্রতিদিন এক মণ (৪০ কেজি) চাল তাদের দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, “আর মাত্র একদিন পরই সেখানকার সবার খাবার শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এখনো সরকারি-বেসরকারিভাবে কোনো খাদ্য সাহায্য পাওয়ার আশ্বাস মেলেনি।”

“ওই পাড়ার বাসিন্দারা জুম চাষী। জঙ্গল কেটে চাষবাস করে সামান্য খাবার জোগার করে। এক বেলা ভালো খেলে আরেক বেলা খায় না। সেখানে ১৬০ মানুষ এসে আশ্রয় নেওয়া খুব সাংঘাতিক ব্যাপার,” বলেন জিরা বম।

বিষয়টি সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক (ডিসি) সবাইকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জেলা প্রশাসন শরণার্থীদের জন্য কম্বলের ব্যবস্থা করবে বলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চেয়ারম্যানকে জানিয়েছে।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম বুধবার সকালে বেনারকে বলেন, “বিষয়টি আমিও শুনেছি। তবে নিশ্চিত হতে পারিনি। প্রথমত, জানতে হবে আসলে কেউ ঢুকছে কিনা।”

“আমরা বিজিবিকে (বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ) বিষয়টি দেখার জন্য বলেছি। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়েছে” বলেন তিনি।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. আবুল কালাম বেনারকে বলেন, “ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। সেখানে শরণার্থী এসেছে তা নিশ্চিত হওয়া গেলে পথ যতই দুর্গম হোক, সাহায্য পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র জোসেফ সূর্য ত্রিপুরা বেনারকে জানান, বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে জানলেও এ ব্যাপারে এখনই কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে পারবেন না।

চীন-আসিয়ানের তত্বাবধানে রাখাইনে নিরাপদ এলাকার প্রস্তাব

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য চীন ও আসিয়ান রাষ্ট্রসমূহের তত্বাবধানে রাখাইনে একটি নিরাপদ এলাকা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।

আর এই প্রস্তাবে মিয়ানমারকে রাজী করতে জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্জেনারের সমর্থন কামনা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন।

বুধবার তার কার্যালয়ে বার্জেনার সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এই আহ্বান জানান।

পরে বাংলাদেশ সফররত হলিউডের তারকা অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সাথে সাক্ষাতে মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন করা না গেলে ওই এলাকায় জঙ্গিবাদের উত্থান হতে পারে এবং তখন সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্জেনারের সাথে বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ন সমাধান চায়। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের পদক্ষেপে বাংলাদেশ হতাশ।

আব্দুল মোমেন বলেন, সফররত বিশেষ দূত তাকে জানান তার সাথে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ আছে।

এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “আমরা তাকে বলেছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। এটা কার্যকর করার যথেষ্ঠ সম্ভবনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী রাখাইনে রাজ্যে একটি নিরাপদ এলাকা হবে। এবং মিয়ানমার চাইলে সেই নিরাপদ এলাকা দেখভাল করবে আসিয়ান রাষ্ট্রসমূহ। এমনকি চীনও সেখানে যোগদান করতে পারে। এবং তারা মিয়ানমারের বন্ধু দেশ। সুতরাং এই প্রস্তাবে মিয়ানমার রাজী হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। আপনারা পরখ করে দেখেন।

তিনি বলেন, উনারা বলেছেন, উনারা দেখবেন।

অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সাথে বৈঠক প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “আমি বলেছি আমরা তাদের এখানে বেশিদিন রাখতে পারবো না। আমরা পৃথিবীর মধ্যে সবচে ঘনবসতিপূর্ন দেশ। আমাদের সম্পদ কম। কিন্ত আমাদের হৃদয় অনেক বড়।

মন্ত্রী বলেন, তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সমর্থন চাইলে তিনি বলেন “আমার সমর্থন সবসময়ই থাকবে।”

আব্দুল মোমেন বলেন, “আমি একটি প্রস্তাব দিয়েছি: আপনি হলিউডে একটি বড় ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেটা করে জনসমর্থন প্রস্তত করেন।… আমি বললাম অনেক দেশ তাদের রক্ষণাবেক্ষনের জন্য করার জন্য আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্ত সাহায্য সেভাবে আসছে না।”

বুধবার সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন