Follow us

শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলায় বাংলাদেশের এক শিশু নিহত

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-04-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
শ্রীলঙ্কায় সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের চার্চগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ছবিটি রাজধানীর কাকড়াইল চার্চের সামনে থেকে তোলা। এপ্রিল ২২, ২০১৯।
শ্রীলঙ্কায় সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের চার্চগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ছবিটি রাজধানীর কাকড়াইল চার্চের সামনে থেকে তোলা। এপ্রিল ২২, ২০১৯।
নিউজরুম ফটো।

পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে শ্রীলঙ্কায় রোববারের ভয়াবহ বোমা হামলায় নিহত হয়েছে জায়ান চৌধুরী নামে এক বাংলাদেশি শিশু। আট বছর বয়সী জায়ান সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাতি। সেলিম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই।

সোমবার বনানীতে শেখ সেলিমের বাসায় দিনভর স্বজন, শুভাকাঙ্খী ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভিড় করেন। রাতে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ শেখ সেলিমের বাসায় যান।

এরপর হানিফ সাংবাদিকদের বলেন, বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় মরদেহবাহী উড়োজাহাজ ঢাকায় নামবে। বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি মাঠে বাদ আসর জানান অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বনানী কবরস্থানে জায়ানকে দাফন করা হবে।

এর আগে  শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেছিলেন, জায়ানের মরদেহ মঙ্গলবার বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। সোমবার সকালে শেখ সেলিমের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা জানানোর পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন শিল্পমন্ত্রী। পরে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়।

শিল্পমন্ত্রী জানান, ওই ঘটনায় জায়ানের বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সও আহত হয়েছেন। শ্রীলঙ্কার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তাঁকে এখনই দেশে আনা হচ্ছে না।

পরে শিল্পমন্ত্রী বেনারকে বলেন, “প্রথমে শিশু জায়ান নিখোঁজ ছিল। পরে শেখ সেলিমের স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা শ্রীলঙ্কায় গিয়ে একটি হাসপাতালে তার মরদেহ শনাক্ত করেন।”

কলম্বোয় বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ বেনারকে জানান, “রোববারের ভয়াবহ বোমা হামলায় এখন পর্যন্ত একজন বাংলাদেশি নিহত ও একজন আহত ছাড়া অন্য কোন বাংলাদেশির হতাহতের খবর নেই।”

প্রসঙ্গত, স্টার সানডের প্রার্থনার মধ্যে রোববার সকাল ও দুপুরে দুই দফায় শ্রীলঙ্কার তিনটি গির্জা ও চারটি হোটেলসহ আটটি স্থানে একযোগে বোমা হামলা ঘটে। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ইতিহাসের ভয়াবহতম ওই হামলায় এ পর্যন্ত ৩২জন বিদেশিসহ ২৯০ জন নিহত ও পাঁচশ’ জনের মতো আহত হয়েছে।

ওই হামলার জন্য ‘ন্যাশনাল তাওহীদ জামায়াত’ নামে শ্রীলঙ্কার একটি উগ্রপন্থী মুসলিম সংগঠনকে দায়ী করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত অন্তত ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় হামলার ঘটনায় শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ । বর্তমানে ব্রুনেই সফরে থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন।

শেখ সেলিমের পারিবারিক সূত্র জানায়, ছুটি কাটাতে দুই ছেলে জায়ান চৌধুরী ও জোহান চৌধুরীকে নিয়ে কলম্বো যান মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স ও শেখ আমিনা সুলতানা সোনিয়া দম্পতি। সেখানে তারা একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ওঠেন।

রোববার সকালে বোমা হামলার সময় হোটেলটির নিচতলায় খেতে গিয়েছিলেন মশিউল হক ও তাঁর ছেলে জায়ান। এ সময় ছেলে জোহানকে নিয়ে হোটেলের ছয়তলায় নিয়ে ছিলেন সোনিয়া।

শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থা

বোমা হামলার পরে সোমবার মদ্যরাত থেকে শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থা জারি করা হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়তেই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল জরুরি অবস্থা জারির এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের মিডিয়া ইউনিট।

এর ফলে আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করার অনেক বেশি ক্ষমতা পাবে দেশটির পুলিশ ও সেনাবাহিনী। তবে এ ক্ষেত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হবে না বলে আশ্বস্ত করা হয় বিবৃতিতে।

রাজধানী কলম্বোয় টানা দ্বিতীয় রাতের মতো কারফিউ জারি করেছে শ্রীলঙ্কার সরকার। সোমবার রাত ৮টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত এই কারফিউ বলবৎ থাকবে।

বাংলাদেশ দূতাবাসে হট লাইন চালু

শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ বোমা হামলার পরপরই দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপদে থাকার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ হাইকমিশন। পাশাপাশি একটি হট লাইনও চালু করে।

হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ জানান, শ্রীলঙ্কায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করতে পারে সে জন্য কলোম্বোর বাংলাদেশ মিশনে একটি হটলাইন (+৯৪৭১২৪০৬৩১৩) খোলা হয়েছে।

তিনি জানান, দেশটিতে অবস্থান করা বাংলাদেশিদের নিরাপদে থাকতে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে।

কোনো হুমকি নেই

বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার মতো হামলার কোনো আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

সোমবার বনানীতে শেখ সেলিমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক আছে। ঝুঁকিযুক্ত বা ঝুঁকিমুক্ত এমন প্রশ্ন আসে না।”

“আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী সর্বাত্মক সচেষ্ট আছে, সতর্ক আছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে সেরকম তথ্য আমাদের কাছে নেই,” বলেন তিনি।

এর আগে গত ৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর থেকে বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের চলাচলের ওপর নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ৭ এপ্রিল ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে অ্যালার্ট দেয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি । এত চমৎকার পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও কেন তারা সন্তুষ্ট না, বুঝতে পারছি না। অ্যালার্ট জারি তাদের প্র্যাকটিসে পরিণত হয়েছে।”

এর আগে ৫ এপ্রিল মার্কিন সতর্কবার্তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ঝড়ঝাপটা ও নানা দুর্যোগের মধ্য দিয়েও বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন হঠাৎ করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা সতর্কবার্তা জানিয়েছে, কিন্তু কেন তারা এ ধরনের সতর্কবার্তা দিল তা বুঝতে পারলাম না।

তবে হুমকি না থাকলেও নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বেনারকে বলেন, “আমরা শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত। কিন্তু এটা রিল্যাক্স করলে চলবে না।”

তিনি বলেন, “শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোকাবিলা করবে তা নয়, সরকার, জনগণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় দরকার। বিশেষ করে সুশীল সমাজকে বেশি এগিয়ে আসতে হবে।”

ইশফাক ইলাহী বলেন, “আমাদের কিছু কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী আছে যারা জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে উগ্র মতবাদকে সহায়তা করে থাকে, তাদের ওপর নজরদারি এবং তাদেরকে সতর্ক করা উচিত। যাতে তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত না হয়। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান মনে করেন, “আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী এবং দেশের জনগণ এই ধরনের জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদকে পছন্দ করে না এবং আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না। এ কারণেই আমাদের দেশ মোটামুটি শান্ত আছে।”

শ্রীলঙ্কার হামলা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা উল্লেখ করে এ ধরনের সন্ত্রাসবাদ রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

“যাতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্য ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইমের ওপর নজর দেওয়া উচিত। যে যেখানেই তথ্য পাবে তা শেয়ার করলে এ ধরনের অপরাধ কিছুটা প্রতিরোধ করা যাতে পারে,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশ যেমন হলি আর্টিজানের সবকিছু উদ্‌ঘাটন করে সবাইকে জানিয়েছে তেমনি শ্রীলঙ্কার সরকারও এ হামলার সত্য উদ্‌ঘাটন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে এক প্রশ্নের উত্তরে ডিএমপি ডেপুটি কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বেনার নিউজকে বলেছেন, আমাদের দেশে এই রকম কোনো সংগঠন নেই। এই ঘটনায় দুই দেশের সন্ত্রাসীদের সাথে কোনো যোগসূত্রও আমরা পাই নি।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নজিরবিহীন এক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে ১৭জন বিদেশিসহ ২০ জন নিহত হয়।

‘আল্লাহর আইন কায়েম ও প্রচলিত বিচার পদ্ধতি’ বাতিলের দাবি জানিয়ে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের ৬৩ জেলার প্রায় পাঁচশ’ স্পটে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেয় জঙ্গি সংগঠন জামা’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এতে দু’জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছিলেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন