বাংলাদেশের বড়ো প্রকল্পে একচেটিয়া চীন, এবার যুক্তরাষ্ট্রকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাল সরকার

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.01.20
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
বাংলাদেশের বড়ো প্রকল্পে একচেটিয়া চীন, এবার যুক্তরাষ্ট্রকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাল সরকার ঢাকার আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে ১২-১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের করোনাভাইরাস টিকা দেয়ার কর্মসূচি উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক ও শিক্ষা মন্ত্রী দিপু মনির সাথে কথা বলছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার (বামে)। ১ নভেম্বর ২০২১।
[বেনারনিউজ]

চীনের পাশাপাশি এবার বাংলাদেশের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে ‘অংশগ্রহণের’ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

বুধবার বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাঁর সাথে দেখা করলে তিনি এই আহ্বান জানান বলে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয়ে র‌্যাবের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধকে কেন্দ্র করে সরকারের সাথে চলমান বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যেই এমন আহ্বান জানানো হলো।

বাংলাদেশে পদ্মাসেতুসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে আধিপত্য রয়েছে চীনা কোম্পানির, সড়ক, রেলপথ, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে চীনা অর্থায়নে। আবার অনেক প্রকল্পে চীনা ঠিকাদার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করছে।

মেগা প্রকল্পগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগ অথবা সংশ্লিষ্টতা নেই বললেই চলে।

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে আমেরিকাকে অংশগ্রহণের আহ্বানের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে।

তবে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রকে অংশগ্রহণের কথা বলায় “কোনো সমস্যা দেখি না,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান।

“অতীতে মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে অনেক অবকাঠামো বাস্তবায়ন করেছে। যেমন, বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন করেছে ইউনিকল,” জানিয়ে তিনি বলেন, “পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবের সাথে র‌্যাবের কর্মকর্তাদের ওপর আরোপ করা মার্কিন অবরোধের সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না।”

তিনি বলেন, চীনা কোম্পানিগুলো দরপত্রে নিম্নদর দেয়ায় বাংলাদেশে কাজ পাচ্ছে।

“আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুটি দেশের সাথেই আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো। আমাদের কাছে এক দেশ আরেক দেশের পরিপূরক নয়। দুটি দেশই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন ফারুক খান।

দ্বিপাক্ষিকভাবে আমেরিকার পক্ষ থেকে যদি কোনো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়, তাহলে তা বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

‘সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা’

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেনের মতে, র‌্যাবের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের পর থেকে বাংলাদেশের সাথে মার্কিন সরকারের “সম্পর্ক কিছু খারাপ হয়েছে।”

তাঁর মতে, “সরকারের পক্ষ থেকে বৃহৎ প্রকল্পে আমেরিকাকে অংশগ্রহণ করার যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, সেটি আসলে মার্কিন সরকারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার একটি চেষ্টা হতে পারে।”

তবে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষে বাংলাদেশের বৃহৎ প্রকল্পে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। এর অন্যতম কারণ হলো দুর্নীতি।”

“আমাদের দেশের সকল প্রকল্পের খরচ অনেক বেশি। এই বেশি খরচের কারণ দুর্নীতি। চীনারাও আমাদের দেশের দুর্নীতির সাথে মানিয়ে নিয়েছে” বেনারকে বলেন তৌহিদ হোসেন।

তিনি জানান, “চীনারা সারা বিশ্বে দুর্নীতির বিস্তার ঘটাচ্ছে। অন্যান্য দেশে তারা যেমন ঘুষ দেয়, সেরকম আমাদের দেশেও ঘুষ দিচ্ছে, এমন অভিযোগ রয়েছে। বিদেশে দুর্নীতির বিস্তার ঘটানো অথবা অন্যকোনো দেশে ঘুষ দেয়ার জন্য চীনা কোম্পানিগুলোকে শাস্তি পেতে হয় না।”

“অন্যদিকে মার্কিন কোনো কোম্পানি বিশ্বের কোনো দেশকে ঘুষ প্রদান করলে সেটি ফেডারেল আইনে অপরাধ হিসাবে গণ্য হয় এবং ওই কোম্পানিকে শাস্তি পেতে হয়,” বলেন তৌহিদ হোসেন।

তাঁর মতে, “সরকার যে বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘ভুল বোঝাবুঝির’ কারণে র‌্যাবের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ দেয়া হয়েছে-কথাটা সঠিক নয়।”

“র‌্যাবের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবরোধ দেয়ার আগে মার্কিন সরকার তাদের নিজস্ব উৎস থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়েছে এবং গত কয়েক বছর ধরে র‌্যাবের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে মার্কিন মানবাধিকার প্রতিবেদনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে উল্লেখ করা হচ্ছিল,” যোগ করেন সাবেক ওই পররাষ্ট্রসচিব।

মার্কিন কোম্পানি আসতে পারে?

চীনের সাথে সারা বিশ্বকে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে যুক্ত করতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বেইজিং। বাংলাদেশও এই চীনা উদ্যোগের সহযোগী। তবে ভারত এই উদ্যোগের অংশ নয়।

গত বছর ১৪ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ায় জাকার্তা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া ভাষণে চীনের বৈশ্বিক যোগাযোগ প্রকল্পের বিপরীতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোতে বন্দর, বাঁধসহ উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ করার ঘোষণা করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন।

তিনি বলেন, “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোতে উন্নত অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল মনে করা হয়। অথবা দেশগুলো অন্যান্য দেশের নির্ধারণ করা শর্তানুসারে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হয়।”

“এই প্রেক্ষাপটে আমরা এই অঞ্চলের দেশগুলোতে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী উন্নতমানের অবকাঠামো নির্মাণ করব,” জানান ব্লিনকেন।

বাংলাদেশের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণের বিষয়ে মার্কিন সরকার ইতিবাচকভাবে চিন্তা করতে পারে বলে মনে করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির।

তাঁর মতে, “মার্কিন সরকার ও তার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, চীন সারা বিশ্বে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করেই এগিয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই মার্কিন সরকারের নেতৃত্বে ‘বিল্ড, ব্যাক, বেটার’ অবকাঠামো ফান্ডের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।”

“মার্কিন কোম্পানিগুলো আমাদের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে আমরাও চীনাদের একটি বিকল্প পাবো,” বলেন হুমায়ূন কবির।

‘এভাবে মার্কিন নীতি পরিবর্তন হবে না’

তবে বাংলাদেশের প্রকল্পে বিনিয়োগ করলেই মার্কিন নীতি পরিবর্তন হবে এমন চিন্তা করা “খুবই অপরিপক্ব” একটি কাজ হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল।

তাঁর মতে, মার্কিন সরকার “বাংলাদেশের ব্যাপারে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতার দিকে জোর দিয়ে নীতি গ্রহণ করেছে।”

তিনি বলেন, “প্রকল্পে অংশগ্রহণের প্রস্তাব না দিয়ে বরং মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণতন্ত্র ইত্যাদির ব্যাপারে যেসব আপত্তি তোলা হয়েছে সেগুলো সুরাহা করার ব্যবস্থা নিলে তবেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হতে পারে অথবা মার্কিন নীতির পরিবর্তন হতে পারে।”

বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের পরিবর্তে ‘চীনা কায়দায়’ দেশ চালাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের বিকল্প হিসাবে যে উন্নয়নের কথা বলছে সেটি আসলে উন্নয়ন নয়। উন্নয়ন কখনও গণতন্ত্রের বিকল্প হতে পারে না। বরং, গণতন্ত্রের মাধ্যমে উন্নয়ন করতে হবে।”

রোহিঙ্গা ও করোনাভাইরাস ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে

বাংলাদেশের সাথে উন্নয়ন ও সামরিক খাতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে চীন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়। তখন থেকে সব মিলিয়ে এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।

মিয়ানমার সরকারের মূল সমর্থনদাতা দেশ চীনের অসহযোগিতার কারণে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে আসছে মার্কিন সরকার। শরণার্থীদের জন্য ২০১৭ সাল থেকে বিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছে দেশটি।

একইসাথে, করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলা করতে বাংলাদেশ সরকারকে এ পর্যন্ত ১২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে মার্কিন সরকার।

মার্কিন দূতাবাসের ফেসবুক পেজে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশকে দুই কোটি ৮৬ লাখ করোনাভাইরাস টিকা সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন