Follow us

নিরানন্দ এক ঈদের মুখোমুখি কৃষকেরা

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-06-03
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
মাঠ থেকে ধান সংগ্রহ করছেন কৃষকেরা। মানিকগঞ্জ, আগস্ট ২৭, ২০১৮।
মাঠ থেকে ধান সংগ্রহ করছেন কৃষকেরা। মানিকগঞ্জ, আগস্ট ২৭, ২০১৮।
ছবি: এএফপি

আমনের পর বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষকের হাসি মিলিয়ে গেছে। কৃষক পরিবারের সদস্যরা আসন্ন ঈদের কেনাকাটা করতে পারছেন না।

ঈদ উপলক্ষে ছেলেমেয়ের নানা চাহিদা আর সংসারের অভাব নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে পাবনার ভাঙ্গুরা উপজেলায় সেলিম হোসেন (৪৫) নামের এক কৃষক গত ২১ মে আত্মহত্যা করেন।

এর আগে গত কয়েক সপ্তাহজুড়ে পাকা ধানখেতে আগুন দিয়ে, মই চালিয়ে, রাস্তায় ধান স্তূপ করে ও ছিটিয়ে মানববন্ধন-সমাবেশ করে ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদ শুরু করেন দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক।

সুনামগঞ্জের তাহেরপুর উপজেলার স্থানীয় কৃষক সারোয়ার হোসেন লিটন বেনারকে বলেন, হাওরের যেসব পরিবার এখনো শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল, আসন্ন ঈদে তারা মহা বিপাকে পড়েছে। সারা বছর কীভাবে চলবে, পরিবার কীভাবে চালাবে তা নিয়েই দুশ্চিন্তার শেষ নেই তাদের; কাপড় কেনা বা ঈদ করা অনেক দূরের বিষয়।”

“ফলন ভালো হওয়ার পরও দাম অস্বাভাবিক কম থাকায় উৎপাদন খরচের ৫০ থেকে বড় জোর ৭০ শতাংশ উঠেছে,” বলেন তিনি । হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের এই সদস্যসচিব আরও বলেন, হাওরের কৃষক পরিবারে এখন উৎসবের আমেজ নেই।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, দেশ কৃষি পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৩। আর দেশের শ্রম শক্তির প্রায় অর্ধেকই কৃষক। কৃষকদের চলমান দুরবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের একাধিক কৃষি অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সদস্য অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “কৃষকের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া বা তাদের উৎপাদন খরচ উঠে না আসা দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত। ”

এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, ধানসহ কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের লক্ষ্যে চাষিদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন ও ফসলের ক্রয়মূল্য অগ্রিম নির্ধারণ করে মৌসুমের শুরুতেই সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহসহ বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

অনিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্বভোগী

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের প্রধান জসিম বলেন, “এখনই শুধু কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা দরকার। প্রতি মন ধানের দাম এক হাজার ২০ টাকা নির্ধারণ করে সরকার যে সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে, সেখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের (ধানকল ও চাতালের মালিক) নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। ”

“তৃণমূলে প্রতি ‘ব্লকে’ আমাদের সরকারি কৃষি কর্মকর্তা আছেন। তারা জানে কোন কৃষকের কতটুকু উৎপাদন হয়েছে। তাদের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছে গিয়ে যদি ধান কিনে আনা যায়, তাহলে এই অবস্থার একটা আশু সমাধান হতে পারে,” বলেন তিনি।

এ ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রীর দাবি, “সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান কেনা হবে।” তবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কেনার ক্ষেত্রে দাদন ব্যবসায়ীরাও বড় বাঁধা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়ন অনুষদের প্রধান কামরুজ্জামান বলেন, “কৃষকদের দাদন ব্যবসায়ীদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে শষ্যগুদাম ঋণ কর্মসূচি। ”

“একসময় এই কর্মসূচি চালু ছিল। এর মাধ্যমে মজুত পণ্যের বিপরীতে সরকার দেওয়া টাকায় কৃষক দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করে নিজস্ব মালিকানায় পণ্য মজুত করতে পারতেন,” বলেন তিনি।

বোরো মৌসুমে সরকার সাড়ে ১২ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধান সংগ্রহ করা হবে দেড় লাখ মেট্রিক টন, বাকিটা চাল ও গম। ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ধান-চাল সংগ্রহের এই অভিযান ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে৷

এ বছর এক কোটি ৯৬ লাখ টন বোরো উৎপাদন হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

বাংলাদেশি গণমাধ্যমগুলো বলছে, বর্তমানে প্রতি মণ ধানের দাম স্থানভেদে ৪০০-৫০০ টাকা। অথচ প্রতি মণ ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ৭০০-৮০০ টাকা। গড়ে মণপ্রতি ৩০০ টাকা লোকসান হচ্ছে কৃষকের। দুই মণ ধানের দামেও একজন দিনমজুর মিলছে না।

কৃষিমন্ত্রীর অভিমত, “২০১৭ সালে চাল আমদানির শুল্ক রেয়াতের কারণে চাহিদার অতিরিক্ত চাল আমদানি, তার বড় একটি অংশ মজুত এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় এ বছর ধানের দাম কমে গেছে।”

চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত

ধানের বাজার মূল্যের বিষয়ে সরকারের নেওয়া কার্যক্রম জানাতে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, “১০ থেকে ১৫ লাখ টন চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ”

কৃষি অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষার অধ্যাপক জসিম বলেন, “দ্রুত চাল রপ্তানি শুরু করা গেলে ধানের মূল্য কিছুটা বাড়বে। সেই হিসাব করে সরকার হয়তো এটা করতে চাচ্ছে। ”

মন্ত্রী রাজ্জাক বলেন, “খাদ্য নিরাপত্তা ঠিক রেখে চাল রপ্তানি করা হবে। ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে। চাল আমদানি নিরুৎসাহিত এবং চাল রপ্তানিকে উৎসাহিত করা হবে। ”

চালের আমদানি শুল্ক ২৮ ভাগ থেকে বাড়িয়ে ৫৫ ভাগ আরোপ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গত ২২ মে বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেদিনই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের দশ মাসে প্রায় তিন লাখ তিন হাজার টন চাল আমদানি করা হয়েছে।

দেশীয় কৃষকদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী চাল আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর বৃদ্ধি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সরকারি হস্তক্ষেপ ও ভর্তুকি প্রত্যাশা

এপ্রিলের মাঝামাঝি ধান কাটার সময় শুরুর পর প্রথম শ্রমিক সংকটের মুখোমুখি হন ধানচাষীরা। যা কাটিয়ে ওঠার আগেই ধানের দাম কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ প্রকাশ শুরু হয়।

রাজধানী ঢাকাতেও বিক্ষোভ প্রদর্শন ও আলোচনা আয়োজন করে কৃষক স্বার্থ সংরক্ষণে সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করে বহু সংগঠন।

জাতীয় প্রেসক্লাবে সোমবার এক জাতীয় সংলাপে দাবি করা হয়, দেশের কৃষকেরা যদি বর্তমান দামে তাদের ৬৫ শতাংশ ধান বিক্রি করে দেন, তাহলে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার লোকসান হবে।

এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী বাজেটে (২০১৯-২০ অর্থবছর) কৃষি খাতে ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলেও জানান গবেষকরা।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে সরকারি গুদামের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরকারের ধান সংগ্রহের পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করে ৫০ লাখ মেট্রিকটনে উন্নীতকরণের উদ্যোগও রয়েছে।

অধ্যাপক জসিম বলেন, “বর্তমানে আমাদের সরকার মোট উৎপাদনের মাত্র ছয় শতাংশ খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করে। এটা এই মুহুর্তে কমপক্ষে ১২ শতাংশে উন্নীত করা উচিত।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন