Follow us

সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে অবশেষে সাক্ষ্য দিলেন অজয় রায়

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-10-28
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
অভিজিৎ হত্যা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন মামলার বাদী তাঁর বাবা শিক্ষাবিদ অজয় রায়।  ঢাকা  অক্টোবর ২৮, ২০১৯।
অভিজিৎ হত্যা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন মামলার বাদী তাঁর বাবা শিক্ষাবিদ অজয় রায়। ঢাকা অক্টোবর ২৮, ২০১৯।
ছবি: বেনার নিউজ

জঙ্গিদের হাতে নিহত ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় গাফিলতির কারণে সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলি জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে সরিয়ে দেয়ার পর ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে সোমবার আদালতে সাক্ষ্য দিলেন অধ্যাপক অজয় রায়।

ঢাকা মহানগর আদালতের রাষ্ট্রীয় প্রধান কৌঁসুলি আবু আব্দুল্লাহ বেনারকে বলেন, অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিচারিক প্রক্রিয়ায় গাফিলতি করেছেন সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালের সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলি (পিপি) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তাই তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

১ আগস্ট চার্জ গঠনের পর থেকে তিনবার সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও মামলার বাদী অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়ের অনুপস্থিতির কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যায়নি। তিনি বলেছিলেন, ছেলে হত্যার বিচারের জন্য আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাবেন না।

জাহাঙ্গীর আলম ১৬ অক্টোবর বেনারকে বলেন, অধ্যাপক অজয় রায় আদালতে না আসলে তার কিছু করার নেই।

অভিজিৎ রায়ের বাবার সাক্ষ্য না দিলে আসামিদের সাজা হওয়ার অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে বলে আইনজীবীরা জানান। এরপরই সরিয়ে দেয়া হয় জাহাঙ্গীর আলমকে।

তবে সোমবার আদালতে সাক্ষ্য দিতে হাজির হন অসুস্থ অধ্যাপক অজয় রায়। চেয়ারে বসিয়ে সন্ত্রাস বিরোধী আদালতে হাজির করা তাকে।

পিপিকে সরানো হয়েছে

ঢাকা মহানগর আদালতের রাষ্ট্রীয় প্রধান কৌঁসুলি আবু আব্দুল্লাহ বেনারকে বলেন, “অধ্যাপক অজয় রায়কে আদালতে সাক্ষ্য দিতে রাজি করাতে তার কাছে যাননি আগের পিপি। এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলির পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

তিনি জানান, সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালের পিপি হিসাবে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি।

আবু আব্দুল্লাহ বলেন, “স্যারের (অধ্যাপক অজয় রায়) সাক্ষ্যের কারণে মামলার বিচার প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা কেটে গেল। আমরা আশা রাখি অপরাধীদের কঠোর শাস্তি হবে।”

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বেনারকে বলেন, “আমি অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার ব্যাপারে কোন গাফিলতি দেখাইনি। গাফিলতির অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য। আমি কয়েকদফা অভিজিৎ রায়ের বাবাকে ফোন করে আদালতে আসতে বলেছি। উনি বলেছেন, উনি আসবেন না। উনি না আসলে আমার কী করার আছে?”

তিনি বলেন, “আমি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জানিয়েছি, তারা যেন স্যারের সাথে দেখা করে ওনাকে আদালতে নিয়ে আসেন।”

অধ্যাপক অজয় রায়ের কাছে সশরীরে হাজির হয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “সাক্ষীর কাছে যাওয়া আমার কাজ নয়। আমি হোলি আর্টিজান হামলা মামলা নিয়ে অনেক ব্যস্ত ছিলাম। সে কারণে আমি তাঁর কাছে যেতে পারিনি।”

সাক্ষ্য গ্রহণের প্রথম তারিখ ছিল ১১ সেপ্টেম্বর। এরপরে দ্বিতীয় তারিখ ছিল ৬ অক্টোবর। সাক্ষ্যগ্রহণের তৃতীয় তারিখ নির্ধারিত হয় ১৬ অক্টোবর। সেদিনও সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। সেদিন আদালত ২৮ অক্টোবর পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেন।

সোমবার সকাল ১০টার পরে আদালতে আসেন অধ্যাপক অজয় রায়। বেলা দুটার পরে আদালতে আসামিদের হাজির করা হয়।

এরপর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহন।

সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইবুনালের নিয়মিত বিচারক মুজিবুর রহমান না থাকায় ভারপ্রাপ্ত বিচারক জেসমিন আরা সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।

অধ্যাপক অজয় রায় ছাড়াও সোমবার আদালতে আরও দুজন প্রত্যক্ষদর্শী আদালতে সাক্ষ্য দেন বলে বেনারকে জানান আদালতের ডেস্ক কর্মকর্তা রুহুল আমিন।

মামলার বাদী হিসেবে অধ্যাপক অজয় রায় জবানবন্দিতে বলেন, “২০১৫ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে আমার বড় ছেলে অভিজিৎ রায়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় (টিএসসি) রাজু ভাস্কর্যের একটু সামনে আসামিরা চাপাতি দিয়ে আঘাত করে। ওকে বাঁচানোর জন্য তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা চেষ্টা করে। তাকেও আঘাত করা হয়। আঘাতের কারণে তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে পড়ে যায়।”

তিনি বলেন, “খবর পেয়ে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। সেখানে অভিজিৎ মারা যায়। তার স্ত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর একদিন পরেই শাহবাগ থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করি।”

অজয় রায় বলেন, অভিজিৎ রায় মুক্তমনা ব্লগে লিখতেন।

আইনজীবী না থাকায় অধ্যাপক অজয় রায়কে জেরা করেন আসামি শফিউর রহমান ফারাবি।

ফারাবি অজয় রায়কে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনার ছেলে অভিজিৎ মুক্তমনা ব্লগে লিখতেন। সেটা ঠিক আছে, কিন্তু মুক্তমনা ব্লগে কি লিখতেন? সে তো রাসুলুল্লাহ (সা.) ও ইসলামকে অবমাননা করে লিখত। ঠিক না?”

অজয় রায় শান্ত কণ্ঠে বলেন, “ও কখনো ইসলামকে অবমাননা করেনি।”

জবানবন্দি ও জেরা গ্রহণ শেষে কার্যক্রম মুলতবি করে আগামী ১৮ নভেম্বর সাক্ষীর জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেন আদালত।

অধ্যাপক অজয় রায় বেনারকে বলেন, “আমি আজ সাক্ষ্য দিয়েছি। বিচার চেয়েছি।” তবে তিনি গত তিন তারিখে আদালতে হাজির না হওয়ার কারণ বলেননি।

২০১৫ সালে একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণের জন্য আমেরিকা থেকে সস্ত্রীক ঢাকায় আসেন অভিজিৎ রায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরের কাছে তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে জঙ্গিরা।  চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই হামলায় স্ত্রী রাফিদা আহমেদ দুটি আঙুল হারান।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এই মামলা তদন্ত করে। তারা গত ১৩ মার্চ আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান ও সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।

মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত অপর আসামিরা হচ্ছে; আরাফাত রহমান ওরফে শামস ওরফে সাজ্জাদ, মোজাম্মেল হোসেন ওরফে সায়মন ওরফে শাহরিয়ার, আবু সিদ্দিক ওরফে সোহেল ওরফে সাকিব, আকরাম হোসেন আবির ওরফে আদনান ও শফিউর রহমান ফারাবী। আসামিদের মধ্যে জিয়াউল ও আকরাম পলাতক। বাকিদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন