Follow us

বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হলো চীনা নির্মিত দুটি যুদ্ধ জাহাজ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-01-09
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নৌবাহিনীর মোংলা জেটিতে পৌঁছানো চীনে নির্মিত দুটি যুদ্ধ জাহাজের একটি। ৯ জানুয়ারি ২০২০।
নৌবাহিনীর মোংলা জেটিতে পৌঁছানো চীনে নির্মিত দুটি যুদ্ধ জাহাজের একটি। ৯ জানুয়ারি ২০২০।
[ছবি: আইএসপিআর]

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো চীনা নির্মিত দুটি যুদ্ধ জাহাজ। চীনে নির্মিত ওমর ফারুক ও আবু উবাইদাহ নামের ফ্রিগেট দুটি বৃহস্পতিবার মংলা বন্দরে পৌঁছেছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ।

খুলনা নৌ-অঞ্চল কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ মুসা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে জাহাজ দুটিকে স্বাগত জানান।

এর আগে ১৮ ডিসেম্বর নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরীর উপস্থিতিতে সাংহাইয়ের সেনজিয়া শিপইয়ার্ডে ঐতিহ্যবাহী রীতিতে জাহাজ দুটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিকট হস্তান্তর করা হয়।

সাম্প্রতিক বছরে চীনের কাছ থেকে দুটি সাবমেরিন ক্রয় এবং দেশটির সহায়তায় বাংলাদেশে সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণ উদ্যোগের পর এবার এই দুটি ফ্রিগেট কিনল বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি কর্ণেল (অব.) ফারুক খান বেনারকে বলেন, “আমরা চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কিনেছি, দুটি ফ্রিগেট কিনেছি। কারণ আমরা আমাদের নৌবাহিনীকে আধুনিকায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

তিনি বলেন, “আমরা কোনো বিশেষ দেশ, যেমন শুধু চীনের কাছ থেকে সমরাস্ত্র কিনছি না। আমরা ভালো জিনিস কিনছি। আমরা আমাদের সুবিধামতো ভালো সামগ্রী যে দেশ থেকে পাব সেখান থেকেই কিনব।”

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করতে চায় চীন। তা ছাড়া দেশটি থেকে সমরাস্ত্র পাওয়া সহজ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করতে চায় চীন। তাদের এই নীতির কারণ হলো, তাদের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কার্যক্রমকে বাস্তবায়ন করতে ভারতীয় মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা।”

তিনি বলেন, “এই তিন দেশের সাথে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে ভূরাজনীতিতে চীন প্রভাব বৃদ্ধি করতে চায়। সে কারণে হয়তো তারা বাংলাদেশকে ফ্রিগেট ও সাবমেরিন দিয়েছে, দিচ্ছে। চীনের কারণে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হাতে গোনা কয়েকটি দেশের একটি যাদের সাবমেরিন রয়েছে, যদিও সাবমেরিন দুটো কনভেনশনাল।”

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত বলেন, “আর আমরা চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন, ফ্রিগেট কিনছি আমাদের নিজেদের স্বার্থে। সরকার ব্লু-ইকোনমিতে জোর দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে আমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল রক্ষা করতে ও পাহারা দিতে নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে।”

তিনি বলেন, “চীনের কাছ থেকে সহজে সমরাস্ত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সাথে তাদের শক্তিশালী সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। তারা সহজ শর্তে বিক্রি করে। পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন আমেরিকা বাংলাদেশের কাছে নতুন ফ্রিগেট বিক্রি করবে না। সেখানে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।”

“সে কারণে চীন আমাদের জন্য একটি ভালো উৎস,” যোগ করেন ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত।

জাহাজ দুটির বৈশিষ্ট্য

যুদ্ধজাহাজ দুটির প্রতিটি দৈর্ঘ্যে ১১২ মিটার এবং প্রস্থে ১২.৪ মিটার যা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৪ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে সক্ষম বলে এক বিবৃতিতে জানায় আইএসপিআর।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিটি জাহাজ বিভিন্ন আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জামে সুসজ্জিত। জাহাজ দুটিতে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন কামান, ভূমি থেকে আকাশে এবং ভূমি থেকে ভূমিতে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক সারভাইলেন্স রাডার, ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম, সাবমেরিন বিধ্বংসী রকেট, রাডার জ্যামিং সিস্টেমসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ সরঞ্জামাদি।

আইএসপিআর জানিয়েছে, সার্বিকভাবে শত্রু বিমান, জাহাজ ও স্থাপনায় আঘাত আনার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে এই দুটি জাহাজের। এ ছাড়া হেলিকপ্টার অবতরণ ও উড্ডয়নের জন্য ডেক ল্যান্ডিংসহ জাহাজে সমুদ্রে উদ্ধার তৎপরতা, সন্ত্রাস ও জলদস্যু দমন এবং চোরাচালান বিরোধী নানাবিধ অপারেশন পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে।

নতুন না পুরোনো?

যুদ্ধ জাহাজ দুটি পুরোনো কি না এবং ফ্রিগেট দুটিতে কত ব্যয় হয়েছে সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান আইএসপিআর পরিচালক।

তবে সাবেক নৌবাহিনী প্রধান আবু তাহের বেনারকে বলেন, “ফ্রিগেট দুটি পুরোনো। কারণ আমাদের মতো দেশের পক্ষে নতুন ফ্রিগেট কেনা খুবই কঠিন। তবে পুরোনো হলেও ফ্রিগেট দুটো আমাদের নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।”

তিনি বলেন, “আমাদের নৌবাহিনীতে শুধু যে চীনা ফ্রিগেট আছে তা নয়। আমরা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যুদ্ধজাহাজ সংগ্রহ করেছি। চীনের কাছ থেকে আমরা নৌ-বাহিনীর সামগ্রী ক্রয় করি কারণ চীন থেকে সহজে কেনা যায়।”

আবু তাহের বলেন, “পুরোনো হলেও ফ্রিগেট দুটির মাধ্যমে আমরা আমাদের নৌবাহিনীর সদস্যদের ফ্রিগেট পরিচালনার দক্ষতা বাড়াতে পারব।”বিশ্বখ্যাত জেনস ডিফেন্স ম্যাগাজিনকে উদ্ধৃত করে ২৩ নভেম্বর চীনের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, চীনের সাংহাই নগরীতে বাংলাদেশে নৌ-বাহিনীর জন্য ফ্রিগেট নতুনভাবে রং করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করছে চীন।

এ বছর ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত জেনস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য নতুনভাবে তৈরি করা জাহাজ দুটিতে ১০০ মিলিমিটার কামান, আটটি ওয়াইজে-৮৩ জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, এইচএইচকিউ-৭ স্বল্প দূরত্বের ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও চার জোড়া ৩৭ মিলিমিটার কামান রয়েছে।

এর আগে জাহাজ দুটি চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ডিকমিশন্ড করে।

জেনস্ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে চারটি ফ্রিগেট পরিচালনা করে। এগুলোর মধ্যে দুটি চীনের তৈরি, একটি দক্ষিণ কোরিয়ার এবং আরেকটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন