Follow us

বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ বিনিয়োগকারী চীন, বেশিরভাগই বিদ্যুৎ খাতে

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-05-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
পটুয়াখালীর পায়রা এলাকায়  ১৩২০ মেগাওয়াটের এই  বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ২০১৪  সালে চীনের বেইজিংয়ে বাংলাদেশ-চীন যৌথ চুক্তি সই হয়। কেন্দ্রটি এ বছরের ডিসেম্বরে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
পটুয়াখালীর পায়রা এলাকায় ১৩২০ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ২০১৪ সালে চীনের বেইজিংয়ে বাংলাদেশ-চীন যৌথ চুক্তি সই হয়। কেন্দ্রটি এ বছরের ডিসেম্বরে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
ছবি: নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির সৌজন্যে

বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকারী দেশ এখন চীন, যা ইতিহাসে এই প্রথম। আর এই বিনিয়োগের বিরাট অংশই দেশের বিদ্যুৎ খাতে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে চীনারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে ১,০৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এর আগে ২০১৭ সালে চীনা বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৯১ মিলিয়ন ডলার। আর ২০১৬ সালে চীনা বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৬১ মিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণ হলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ‘জবাবদিহিতার অভাবকে’ কাজে লাগিয়ে এই খাত থেকে ‘অধিক মুনাফা’ অর্জন করা। জাতীয় সংসদে আ​ইন পাস করে এই খাতে দায়মুক্তি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ সরকার।

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ উন্নয়ন শাখার মহাপরিচালক শামস আল মুজাহিদ বেনারকে বলেন, “চীনারা সারা পৃথিবীতে বিনিয়োগে এগিয়ে আছে। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। গত বছরে তারা বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বৈদেশিক বিনিয়োগকারী।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে মোট সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে ৩,৬১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে চীনা বিনিয়োগ ছিল সর্বোচ্চ ১,০৩০ মিলিয়ন ডলার।

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনের একটি কপি বেনারের কাছে রয়েছে।

২০১৮ সালে বিদ্যুৎ ছাড়াও আর্থিকখাতে ১১৩ মিলিয়ন ডলার, বস্ত্রখাতে ৪০ মিলিয়ন ডলার, ট্রেডিং খাতে ১৫ মিলিয়ন ডলার, নির্মাণ খাতে নয় মিলিয়ন ডলার, চামড়াখাতে এক মিলিয়ন ডলার এবং অন্যান্য খাতে আরও ১৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীনা বিনিয়োগকারীরা।

গত বছর বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে নেদারল্যান্ডস থেকে। ২০১৮ সালে দেশটি বিনিয়োগ করেছে ৬৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাদের বিনিয়োগের সিংহভাগ ৬০৮ মিলিয়ন ডলার গেছে খাদ্যখাতে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর রয়েছে যথাক্রমে তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম স্থানে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে মোট চীনা বিনিয়োগের মধ্যে ৮৩৪ মিলিয়ন ডলারই বিদ্যুৎ খাতে।

এর আগে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে চীনা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ৯০ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ ছিল মাত্র পাঁচ লাখ ডলারের কিছু বেশি। ওই বছর বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বৈদেশিক বিনিযোগ করেছিলো যুক্তরাজ্য, বিনিয়োগ ছিল ৩২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এর পরেই অবস্থান ছিল সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশে ওই দেশটির বিনিয়োগ ছিল ২০২ মিলিয়ন ডলার। একই বছর মার্কিন বিনিয়োগ ছিল ১৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

২০১৬ সালে মোট ৬১ দশমিক চার মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চীনা বিনিয়োগের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ ছিলো চার লাখ ডলারের কিছু বেশি। ওই বছর বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করে সিঙ্গাপুর। বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল যুক্তরাজ্য (৩৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ২১৮ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে তৃতীয় অবস্থানে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

কেন বিদ্যুৎ খাতে এত বিনিয়োগ?

অর্থনীতিবিদ ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশের বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে অনেক বিরূপ কথা শোনা যায়। এখানে দুর্নীতি রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক আইনি জটিলতাও রয়েছে। তারপরও বাংলাদেশে চীন সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী এবং তাদের বিনিয়োগ মূলত বিদ্যুৎ খাতে।”

তিনি বলেন, “তাদের এখানে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করতে আসার উদ্দেশ্য হলো অধিক মুনাফা অর্জন।”

ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, “আমাদের বিদ্যুৎ খাত সবচেয়ে অস্বচ্ছখাতের একটি। এখানে কোনও গভার্নেন্স নেই। সরকার এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ কেনে। অথচ সরকারি নীতি হলো, সবচেয়ে কম দামে কেনা।”

তিনি বলেন, “আমাদের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ঠিক উল্টোটা করছে। এখানে সবচেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। আর এর ভার যাচ্ছে জনগণের ওপর।”

ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, “চীনা বিনিয়োগকারীরা সরকারের কাছের কিছু প্রভাবশালী স্থানীয় কোম্পানী মালিকদের সাথে একত্রিত হয়ে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করছে। ফলে তারা এই খাত থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা পাবে। তারা এই উদ্দেশ্যেই বিনিয়োগ করছে।”

তাঁর মতে, “চীনের এ ধরনের বিনিয়োগ টেকসই নয়। আমাদের দরকার টেকসই প্রকৃত বিনিয়োগ।”

এ বছর ৪ এপ্রিল প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধমান অর্থনীতির একটি। তবে বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ অপর্যাপ্ত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ দেশের মোট জিডিপির একভাগের কম।

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিনমাসে বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে, ৯১০ মিলিয়ন ডলার। গত বছরের প্রথম তিন মাসে ওই পরিমাণ ছিল ৮২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখতে অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণমূলক আইনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

জ্বালানী বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ম. তামিম বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের কারণ হলো, বর্তমানে আমাদের বিদ্যুৎ খাতের প্রায় ৬৫ ভাগ উৎপাদিত হয় গ্যাস থেকে। যদি আমরা আমাদের কয়লা উত্তোলন না করি অথবা নতুন গ্যাস উৎপাদন না করতে পারি তাহলে আমাদের জ্বালানী খাত আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমদানি নির্ভর হয়ে পড়বে।”

তিনি বলেন, “বর্তমানে বেসরকারি কোম্পানিগুলো থেকে সরকার ক্ষেত্র বিশেষ ১৮ টাকা থেকে ২৫ টাকা প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ কেনে। আর ভোক্তা পর্যায়ে অবাণিজ্যিক খাতের বিক্রি করে সাড়ে তিন টাকা থেকে সাড়ে আট টাকায়।”

তিনি জানান, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে স্বল্পদামে বিক্রির কারণে রাষ্ট্রকে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হয়।

সাবেক জ্বালানী উপদেষ্টা ড. তামিম বলেন, “বিদ্যুৎ খাত আমদানি নির্ভর হয়ে পড়লে সেক্ষেত্রে আমাদের ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সর্বনিম্ন দাম হবে আট টাকা।”

আর বেসরকারি কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে পড়লে দাম বৃদ্ধির একটি ঝুঁকি থাকে।

তিনি বলেন, “পরিস্থিতি উন্নতির জন্য দেশে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ করতে হবে অথবা আমাদের কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করতে হবে।”

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত

২০০৮-০৯ সালে বাংলাদেশে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়। সেই সংকট থেকে বাঁচতে সরকার কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ​কেন্দ্র স্থাপন করে। এ ছাড়া বেসরকারি কোম্পানি থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ কিনে পরিস্থিতি সামাল দেয়।

এই প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আইনের লঙ্ঘন হয়। আর আইনি সুরক্ষা পেতে জাতীয় সংসদে ২০১০ সালে বিশেষ আইন পাশ করা হয়। এর ফলে বিদ্যুৎ​ খাতে সরকারি ক্রয় আইন ভঙ্গের জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।

সেই আইন এখনও বাতিল হয়নি, বরং পর্যায়ক্রমে এটি বহাল থাকছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শহীদু্জ্জামান সরকার বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশের মত দেশে রাজনৈতিক সরকারগুলো স্বল্পমেয়াদী ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করে। সরকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বিদ্যুৎ বিভাগকে দায়মুক্তি দিয়েছে।”

তিনি বলেন, “তবে কেউ চাইলে দায়মুক্তির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে পারে। আইনটি ঠিক আছে কি না সে ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত দেবে।”

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের জনসংযোগ পরিচালক সাইফুল হাসান চৌধুরী বেনারকে বলেন, “আমাদের দৈনিক মোট ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ ভাগ আসে বেসরকারি কোম্পানি থেকে।”

তিনি বলেন, “বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সামিট পাওয়ার সবচেয়ে বড়। কোম্পানিটির ক্ষমতা দেশের মোট বিদ্যুৎ ক্ষমতার শতকরা ২০ ভাগ।”

সামিট পাওয়ার সরকার দলীয় সাংসদ ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের ছোট ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান। উল্লেখ্য, দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ​ উৎ​পাদন কেন্দ্রগুলোর মালিকানায় রয়েছেন মন্ত্রী, সাংসদ, সরকার দলীয় নেতা বা ব্যবসায়ীসহ সরকার ঘনিষ্ঠরা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন