Follow us

নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে চীন

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-07-14
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার রমনা এলাকায় সৌর শক্তি ব্যবহার করে সড়কবাতির জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে স্থাপিত সোলার প্যানেল। ২২ জানুয়ারি ২০১৭।
ঢাকার রমনা এলাকায় সৌর শক্তি ব্যবহার করে সড়কবাতির জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে স্থাপিত সোলার প্যানেল। ২২ জানুয়ারি ২০১৭।
[বেনারনিউজ]

চীনের সাথে অংশীদারিত্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মোট ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে চীন।

সৌর ও বায়ু শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গঠিত এই কোম্পানির নাম দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি (বিসিপিসিএল) রিনিউএ্যাবল। এটি দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।

বিসিপিসিএল রিনিউএ্যাবল গঠন উপলক্ষে এর আগে গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। যার ধারাবাহিকতায় আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ কোম্পানি বিসিপিসিএল যাত্রা শুরু করল মঙ্গলবার।

“আমরা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়ন শক্তি থেকে উৎপাদন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি,” বেনারকে বলেন নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল) এর সিইও খোরশেদুল আলম।

ইতিমধ্যেই সিরাজগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট, পাবনার সুজানগরে ৬০ মেগাওয়াট এবং বেড়াতে ১০০ মেগাওয়াটের সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানান খোরশেদুল আলম।

এছাড়া পটুয়াখালীর পায়রাতে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে চীনা প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক তারেক শামসুর রেহমান।

“বাংলাদেশে অব্যাহতভাবে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। আগামীতে তা আরো বাড়বে। আর বিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকেই বেশি ঝুঁকছে,” মন্তব্য করে তিনি বেনারকে বলেন, “এই সুযোগে চীন এগিয়ে এসেছে।”

“তবে আমাদের চাওয়া, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেন সব কাজের স্বচ্ছতা বজায় থাকে,” বলেন তারেক শামসুর রেহমান।

মঙ্গলবার ঢাকা থেকে এনডব্লিউপিজিসিএল এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ. এম. খোরশেদুল আলম ও বেইজিং থেকে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশনের (সিএমসি) চেয়ারম্যান রুয়ান গুয়াং অনলাইনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তিতে সই করেন।

অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগ দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “অ-কৃষি জমির অপ্রতুলতার জন্য সৌর শক্তি ব্যবহার করে বড় আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা যাচ্ছে না। তাই ছাদ সৌর বিদ্যুৎ এবং ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও গৃহীত উদ্যোগসমূহ এগিয়ে চলছে।”

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ২৩ হাজার ৫৪৮ (ক্যাপটিভ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। দেশে ৫৮ লাখ সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে অফ গ্রিড এলাকার মানুষের জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।

মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এক নজরে বিসিপিসিএল রিনিউএ্যাবল

বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি (বিসিপিসিএল) রিনিউএ্যাবল গঠনের জন্য গত বছরের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল) ও চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশনের (সিএমসি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।

গত ৮ জুন এই জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদিত হয়। যেখানে উভয় প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ করে শেয়ার রয়েছে।

কোম্পানির অনুমোদিত মূলধন এক হাজার কোটি টাকা।

বিসিপিসিএল প্রকল্পগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাবনায় ৬০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে ২০৫ একর অকৃষি খাসজমি দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে যাবার লক্ষ্য ২০২১ সালের ডিসেম্বর।

সিরাজগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পের জন্য ২১৪ একর জমি ইজারা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ২০২২ সালের জুনে এ প্রকল্প থেকে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

১২৫ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য পাবনার বেড়া উপজালায় ৪৪৩ একর অকৃষি খাস জমি দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই কেন্দ্রের উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য ২০২২ সালের ডিসেম্বর।

এ ছাড়া পায়রায় ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। উৎপাদন শুরুর লক্ষমাত্রা ২০২৩ সালের ডিসেম্বর।

দেশের অন্যান্য স্থানে আরও ১৬৫ মেগাওয়াট সৌর ও বায়ুভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য স্থান নির্ধারণের কাজ চলছে।

এর আগে পটুয়াখালীর পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের তৈরিকে কেন্দ্র করে ২০১৪ সালে অক্টোবরে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি গঠিত হয়। কোম্পানিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কাজ ইতোমধ্যে শেষ করেছে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও শেষের দিকে।

পায়রাতেই এ কোম্পানির ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরও দুটি ইউনিট নির্মাণ করার কথা রয়েছে।

গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর দেশের জাতীয় গ্রিডে সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রথম সরকারি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কাপ্তাইয়ে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি নির্মাণ করেছিল চীনা প্রতিষ্ঠান জেডটিই কর্পোরেশন।

জ্বালানী বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও সমস্যা হলো, সৌর বিদ্যুতের জন্য প্রচুর জমি দরকার।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ম. তামিম এর আগে বেনারকে বলেছিলেন, “আমাদের দেশে জমির সংকট প্রকট। এ ছাড়া সৌর বিদ্যুতের দামও বেশি পড়ে যায়। এ কারণে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাবনা সত্ত্বেও সফলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন